মাদানি মুসহাফ (৬০৪ পৃষ্ঠা) - বাংলাদেশি হাফেজির সাথে ১-২ আয়াত ভিন্ন হতে পারে
আল-ইখলাসالإخلاص
▶তাফসীর সামারি
সূরা ইখলাসের সূচনা আয়াত قُلۡ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ। মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর প্রতিপালকের পরিচয় ও বংশসূত্র জিজ্ঞেস করল - তিনি কিসের তৈরি, স্বর্ণের না রৌপ্যের - তখন এর জবাবে এ সূরা নাযিল হয় । ‘বলুন’ (قُل) শব্দ দিয়ে প্রথমে নবীকে সম্বোধন করা হয়েছে, কেননা প্রশ্নটি তাঁকেই করা হয়েছিল; কিন্তু পরে তা প্রত্যেক মুমিনের প্রতিও সম্প্রসারিত - যে কথা নবীকে বলতে আদেশ করা হয়েছিল, এখন তা প্রত্যেক মুমিনকেও বলতে হবে । মুখতাসারে এসেছে, আল্লাহ উলূহিয়্যাতে (الألوهية) একক, তিনি ছাড়া কোনো হক মাবুদ নেই । ‘আহাদ’ (أَحَد) শব্দটি একমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য, কারণ গুণ ও কর্মে তিনিই একমাত্র পরিপূর্ণ সত্তা - তাঁর কোনো সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান বা অংশীদার নেই । ইবনে কাসীর বলেন, ‘আহাদ’ অর্থ যিনি সৃষ্ট নন এবং যাঁর সন্তান নেই; সৃষ্ট সত্তা একদিন মরে এবং তার উত্তরাধিকারী হয়, কিন্তু আল্লাহ অবিনশ্বর, তাঁর কোনো উত্তরাধিকারীও নেই । যামাখশারী ও বিকাঈ ব্যাকরণগত দিক বিশ্লেষণ করে দেখান, ‘আল্লাহ’ হলো ‘হুয়া’র খবর এবং ‘আহাদ’ তার বদল বা দ্বিতীয় খবর । বিকাঈ আরও বলেন, ইলাহিয়্যাত একত্বকে আবশ্যক করে - যিনি সকল কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী এবং যাঁর প্রতি সকলে মুখাপেক্ষী, তিনি অবশ্যই পরম এক ।
একাধিক বর্ণনায় এসেছে, মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিল, ‘হে মুহাম্মদ, আপনি যে রবের দিকে আমাদের ডাকছেন তাঁর বংশপরিচয় ও গুণাবলী আমাদের কাছে বর্ণনা করুন।’ কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, তারা প্রশ্ন করেছিল আল্লাহ কিসের তৈরি - স্বর্ণের, রৌপ্যের, নাকি অন্য কিছুর। এর জবাবেই এ সূরা অবতীর্ণ হয় । ইকরিমা থেকে বর্ণিত আছে, ইহুদিরা উযায়েরকে, খ্রিস্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলত, মাজুসীরা চন্দ্র-সূর্যের ও মুশরিকরা মূর্তির উপাসনা করত - সব ভ্রান্তির জবাবেই এ সূরা নাযিল হয় ।
ব্যাকরণ ও অলংকারের সূক্ষ্মতা সূত্রগুলোতে বিস্তৃতভাবে এসেছে। ‘হুয়া’ (هو) হলো দামীরুশ-শা’ন (ضمير الشأن) - অর্থাৎ এমন এক সর্বনাম যা পুরো বাক্যের গুরুত্ব আগেভাগে ঘোষণা করে দেয়, যেন বলা হলো ‘ব্যাপারটি এই যে, আল্লাহ এক’ । আবার ‘হুয়া’কে মুবতাদা ধরলে ‘আল্লাহ’ তার খবর এবং ‘আহাদ’ বদল বা দ্বিতীয় খবর । ‘আহাদ’ ও ‘ওয়াহিদ’-এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে: ‘আহাদ’ এমন একত্ব বোঝায় যাতে কোনো প্রকার সংখ্যা, বিভাজন বা যৌগিকতার লেশমাত্র নেই, আর এটি একমাত্র আল্লাহর জন্যই খাস - ‘যায়েদ আহাদ’ বলা যায় না । যামাখশারী বিস্ময় প্রকাশ করেন কেন এত ছোট সূরা সমগ্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমকক্ষ - কারণ এতে রয়েছে আল্লাহর সত্তা, গুণ ও তাওহীদের সারকথা ।
এ আয়াতের পূর্বে কোনো আয়াত নেই, এটিই সূরার সূচনা। তবে সূরার অভ্যন্তরীণ সংগতিতে এ আয়াত পরবর্তী আয়াত اَللّٰهُ الصَّمَدُ-এর ভিত্তি স্থাপন করে: আহাদিয়্যাত (একত্ব) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সামাদিয়্যাত (অমুখাপেক্ষিতা) আসে - যিনি গুণ-কর্মে একক, তিনিই সেই সত্তা যাঁর প্রতি সমস্ত সৃষ্টি মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন । বিকাঈ সূরাগুলোর পারস্পরিক সংগতি দেখিয়ে বলেন, সূরা আন-নাসর ও সূরা লাহাবে আল্লাহ তাঁর শত্রুর ধ্বংস ও বন্ধুর বিজয় দেখানোর পর শ্রোতার অন্তরে এমন এক মহান কর্তার পরিচয় জানার আকুলতা জাগে যিনি এসব করতে সক্ষম - তাই সূরা ইখলাস এসে সেই মহিমান্বিত সত্তার পরিচয় উন্মোচন করে । বিকাঈ এ-ও বলেন, ‘আহাদ’ দিয়ে শুরু করে নয়, বরং আগে ইলাহিয়্যাত ও পরে আহাদিয়্যাত আনা হয়েছে, কারণ ইলাহ হওয়া একত্বকে অপরিহার্য করে তোলে - একত্ব ইলাহ হওয়াকে নয় ।
কল্পনা করুন এক জনপদে নানা মুখের নানা দাবি - কেউ চাঁদ-সূর্যের পূজা করে, কেউ পাথরের মূর্তিকে প্রভু মানে, কেউ আল্লাহর নামে সন্তান কল্পনা করে। এমন কোলাহলের মাঝে কেউ এসে নবীকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার রব কে, তিনি কেমন, কিসের তৈরি?’ তখন আকাশ থেকে নেমে এল ছোট্ট অথচ মহাসমুদ্রসম এক বাক্য: ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক’ [১][৪][৬]। এই ‘বলুন’ শব্দটি কেবল নবীর জন্য থেমে থাকেনি; নবীর পরে তা প্রতিটি মুমিনের জিহ্বায় স্থানান্তরিত হয়েছে - যে উত্তর সেদিন নবীকে দিতে বলা হয়েছিল, আজ তা আমাদের প্রত্যেকেরই ভাষা [১]। আর ‘আহাদ’ - এমন এক শব্দ যা আল্লাহ ছাড়া আর কারও গায়ে মানায় না, কারণ তিনিই কেবল গুণে-কর্মে পরিপূর্ণরূপে এক [১][৪]। ইবনে কাসীর সূক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দেন একত্বের অর্থ: যা সৃষ্ট, তা একদিন মরে, তার অংশ হয়, উত্তরাধিকারী হয়; কিন্তু আল্লাহ সৃষ্ট নন, তাঁর জন্ম-মৃত্যু নেই, ভাগ নেই, সমকক্ষ নেই [৪]। বিকাঈর ভাষায় এই একত্ব এমন বিশুদ্ধ যে তাতে সংখ্যার ছায়াও পড়ে না - ‘আহাদ’ সেই সত্তা যাঁর বাইরে কিছু অবশিষ্ট নেই যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে [৭]। আর এই একত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ামাত্রই পরের আয়াত স্বাভাবিকভাবে ফুটে ওঠে - ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী’ - কারণ যিনি সত্যিকারের এক, সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারও নন [৪][৬]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
এই আয়াতটি যদি একদম সহজ একটি দৃশ্য দিয়ে বোঝাতে হয়, তবে কীভাবে?
ভাবুন, কেউ কারও পরিচয় জানতে চাইলে আমরা বলি বাবার নাম, বংশ, কে কিসের তৈরি। মক্কার মুশরিকরা ঠিক এভাবেই নবীর কাছে আল্লাহর বংশ ও গঠন জানতে চাইল - তিনি কি স্বর্ণের, না রৌপ্যের ? জবাবে এল এক বিস্ময়কর উত্তর: তিনি কারও মতো নন, তিনি কেবলই ‘এক’ - যাঁর জন্ম নেই, অংশ নেই, সমকক্ষ নেই । যেন প্রশ্নকর্তার গোটা প্রশ্নের কাঠামোটাই ভেঙে দেওয়া হলো - আল্লাহ এমন সত্তা নন যাঁকে উপাদান বা বংশ দিয়ে মাপা যায় ।
‘বলুন’ (قُل) শব্দটি কেন এসেছে, এটি কি কেবল নবীর জন্য?
প্রথমত ‘বলুন’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই সম্বোধন করা হয়েছে, কেননা প্রশ্নটি তাঁকেই করা হয়েছিল - ‘আপনার রব কে, তিনি কেমন’ - আর তাঁকেই আদেশ দেওয়া হয়েছিল এ জবাব দিতে । কিন্তু নবীর তিরোধানের পর এ সম্বোধন প্রত্যেক মুমিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়; যে কথা নবীকে বলতে আদেশ করা হয়েছিল, এখন তা প্রতিটি মুমিনকেই বলতে হবে । বিকাঈ যোগ করেন, ‘বলুন’ কোনো নির্দিষ্ট শ্রোতার সঙ্গে আবদ্ধ না রেখে অবাধে রাখা হয়েছে, যাতে রিসালাতের সর্বজনীনতা বোঝা যায় - যাকেই কথা বলা সম্ভব, তার সবার প্রতিই এ আদেশ ।
‘আহাদ’ আর ‘ওয়াহিদ’ - দুটোরই অর্থ তো ‘এক’, পার্থক্য কোথায়?
সূত্রগুলো দেখায় ‘আহাদ’ (أحد) এমন এক বিশেষ একত্ব বোঝায় যাতে সংখ্যা, বিভাজন বা যৌগিকতার কোনো অবকাশ নেই, এবং তা একমাত্র আল্লাহর জন্যই খাস - তাই ‘যায়েদ আহাদ’ বলা যায় না । আরবিতে ‘আহাদ’ সাধারণত নেতিবাচক বাক্যে ব্যবহৃত হয়, যেমন ‘ঘরে কেউ (আহাদ) নেই’, যা সব ধরনের সংখ্যাকে একসঙ্গে অস্বীকার করে । ‘ওয়াহিদ’ সংখ্যার সূচনা, তার সঙ্গে দুই-তিন যোগ হতে পারে; কিন্তু ‘আহাদ’ এমন পরিপূর্ণ একত্ব যা গুণ-কর্ম-সত্তা সব দিক থেকে একক । তাই আল্লাহর জন্য এ শব্দই সবচেয়ে যথার্থ ।
‘এক’ বলার মধ্যে কি কেবল সংখ্যা বোঝানো হয়েছে, নাকি আরও গভীর কিছু?
কেবল সংখ্যা নয়। সূত্রগুলোর মতে এই একত্ব সত্তা, গুণ ও কর্ম - সব দিক থেকে । আল্লাহর কোনো সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান বা অংশীদার নেই; পূর্ণতা, সুন্দর নামসমূহ ও শ্রেষ্ঠ গুণাবলী এককভাবে কেবল তাঁরই । ইবনে কাসীর বলেন, তিনি সৃষ্ট নন বলেই তাঁর জন্ম, মৃত্যু বা উত্তরাধিকারী নেই । বিকাঈ এ একত্বকে এমন বিশুদ্ধ বলেন যে তাতে কোনো যৌগিকতা বা দ্বিত্বের ছায়া পড়ে না - তিনি নিজ সত্তায় এক, অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল নন । সমগ্র কুরআন ও সকল নবীর আগমন এ একত্ব ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠার জন্যই ।
এত ছোট একটি সূরা কীভাবে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান হয়?
যামাখশারী এ প্রশ্ন নিজেই তোলেন এবং উত্তর দেন: ছোট হলেও এতে আছে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, তাঁর ন্যায় ও তাওহীদের সারকথা । তাফসীর আবু বকর যাকারিয়ায় হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য বলেছেন এবং এর প্রতি ভালোবাসা জান্নাতে প্রবেশের কারণ । ইবনে কাসীরে এমন বহু বর্ণনা এসেছে - কেউ প্রতি রাকাতে এ সূরা পড়তেন বলে নবী জানালেন আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন । জ্ঞান তার বিষয়ের মর্যাদায় মর্যাদাবান হয়, আর এ সূরার বিষয় স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলী - তাই এর শ্রেষ্ঠত্ব ।
এই আয়াতে কোন কোন ভ্রান্ত বিশ্বাসের জবাব দেওয়া হয়েছে?
ইবনে কাসীরে ইকরিমা থেকে বর্ণিত, এ সূরা একসঙ্গে বহু ভ্রান্তির জবাব - ইহুদিরা উযায়েরকে, খ্রিস্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলত, মাজুসীরা চন্দ্র-সূর্যের ও মুশরিকরা মূর্তির উপাসনা করত । বিকাঈ বিস্তারিতভাবে দেখান, ‘আহাদ’ একসঙ্গে খণ্ডন করে খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (পিতা-পুত্র-পবিত্র আত্মা), ইহুদিদের আল্লাহকে দেহধারী ভাবা, মাজুসীদের দ্বৈতবাদ (আলো ও অন্ধকারের দুই স্রষ্টা), সাবিঈদের নক্ষত্রপূজা এবং মুশরিকদের মূর্তিপূজা । এক ‘আহাদ’ শব্দেই সকল প্রকার শিরক ও বহুত্ববাদের মূল কেটে দেওয়া হয়েছে ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
এই আয়াতে আল্লাহ নিজের পরিচয় দিচ্ছেন এক মহিমান্বিত নামে-সামাদ (الصمد)। তাফসিরবিদগণ এই শব্দের অর্থে দুটি প্রধান ধারা তুলে ধরেছেন। প্রথমত, সামাদ সেই সত্তা যাঁর কাছে সমস্ত সৃষ্টি তাদের প্রয়োজনে আশ্রয় নেয়; তিনিই অভীষ্ট, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী আর তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন । জালালাইন সংক্ষেপে বলেন-তিনিই চিরকাল সব প্রয়োজনে অভীষ্ট সত্তা । দ্বিতীয়ত, ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত যে সামাদ সেই নেতা ও সরদার, যাঁর নেতৃত্ব, মর্যাদা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সহিষ্ণুতা পূর্ণতার চরমে পৌঁছেছে । আরও অর্থ এসেছে-যিনি সৃষ্টি ধ্বংস হলেও অবশিষ্ট থাকেন, চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক; যাঁর উদর নেই, যিনি পানাহার করেন না, যাঁর ভেতরে শূন্যতা নেই । আবু বকর যাকারিয়া বলেন, এই সব অর্থই সঠিক, কারণ আসল ও প্রকৃত সামাদ একমাত্র আল্লাহ; সৃষ্টি কোনো দিক দিয়ে আপেক্ষিকভাবে এসব গুণের অধিকারী হলেও আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ । যামাখশারী যোগ করেন, সামাদ গঠিত হয়েছে ‘সামাদা ইলাইহি’ (صمد إليه) থেকে, অর্থাৎ কেউ যখন কারও দিকে অভিপ্রায় করে; তাই তিনি সেই সরদার যাঁর দিকে সব প্রয়োজনে অভিমুখ হওয়া হয় । এই নামটিই তাঁর একত্ব, এক মাবুদ হওয়া ও ইবাদতের একমাত্র যোগ্যতার দাবিকে অনিবার্য করে তোলে ।
এই সূরার শানে নুযূল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে-মুশরিকরা বা কুরাইশরা নবী (সা.)-কে বলেছিল, ‘আপনার প্রতিপালকের গুণাবলি আমাদের সামনে বর্ণনা করুন’; তখন এই সূরা নাজিল হয় । অন্য বর্ণনায় ইহুদিরা উযায়রকে, খ্রিস্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র দাবি করত এবং মুশরিকরা মূর্তিপূজা করত-এই পটভূমিতে সূরাটি অবতীর্ণ হয় ।
যামাখশারী লক্ষ করেন, ‘আল্লাহু আস-সামাদু’ একটি মুবতাদা ও খবরের গঠন, যেখানে আল্লাহ নামটি পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে-সর্বনাম দিয়ে নয় । আল-বিকাঈ এই পুনরাবৃত্তির রহস্য খোলেন-সর্বনাম ব্যবহার করলে যদি কেউ গায়েবের কোনো সীমাবদ্ধতা কল্পনা করে, সেই আশঙ্কা দূর করতেই নামটি আবার আনা হলো; আর বাক্যটি ওয়াও সংযোজক ছাড়া রাখা হয়েছে, কারণ এটি যেন আগের আয়াতের ফলাফল ও তার প্রমাণস্বরূপ । সামাদ শব্দটি ‘ফাআল’ ওজনে ‘মাফউল’ অর্থে গঠিত, অর্থাৎ যাঁর দিকে অভিমুখ হওয়া হয় ।
আল-বিকাঈ দেখান যে প্রথম আয়াতে ‘আহাদ’ (أحد) দিয়ে আল্লাহর একত্ব-বিভাজন ও সমকক্ষ থেকে পবিত্রতা-ঘোষিত হলো, আর এই দ্বিতীয় আয়াত যেন তারই ফলাফল ও দলিল; তাই দুই বাক্যের মাঝে কোনো সংযোজক রাখা হয়নি । আহাদ যদি সমকক্ষহীন একত্বের ঘোষণা হয়, তবে সামাদ সেই একত্বেরই বাস্তব রূপ-কারণ যিনি সকলের অমুখাপেক্ষী আর সকলে যাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি অনিবার্যভাবে একক ও স্বজনহীন । আর পরের আয়াত ‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ’ যেন এই সামাদ-গুণেরই ব্যাখ্যা; যামাখশারী ও ইবন কাসীর বলেন, যিনি জন্ম দেননি ও জন্মগ্রহণ করেননি-এটিই প্রমাণ করে তাঁর অমুখাপেক্ষিতা ও চিরন্তনতা, কারণ যে জন্ম নেয় সে সৃষ্ট ও নশ্বর ।
আগের আয়াতে নবীকে বলা হয়েছিল ঘোষণা করতে-তিনি আল্লাহ, এক। সেই একত্বের কথা যেন এই আয়াতে আরও গভীরে নেমে আসে একটি নামে: আস-সামাদ। শব্দটির ভেতরে দুটি ছবি একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। একদিকে তিনি সেই আশ্রয়, যাঁর দিকে গোটা সৃষ্টি-জানা হোক বা না-জানা-নিজের প্রতিটি প্রয়োজনে মুখ ফেরায়; পিপাসার্ত যেমন পানির দিকে ছোটে, তেমনি প্রতিটি অস্তিত্ব নিজের টিকে থাকা ও অভাব পূরণের জন্য তাঁরই কাছে হাত পাতে, আর তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না [১][২][৪]। অন্যদিকে তিনি সেই সরদার, যাঁর নেতৃত্ব ও মর্যাদা পূর্ণতার শেষ সীমায় পৌঁছেছে, যাঁর জ্ঞান-প্রজ্ঞা-সহিষ্ণুতার ওপরে আর কিছু নেই [৪][৭]। কেউ বলেছেন, তিনি সেই সত্তা যাঁর ভেতরে কোনো শূন্যতা নেই, যিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী নন, সৃষ্টি মুছে গেলেও যিনি অবশিষ্ট থাকেন [১][৪]। আবু বকর যাকারিয়া সুন্দরভাবে মিলিয়ে দেন-এসব অর্থই সত্য, কারণ সৃষ্টি কোনো দিক দিয়ে আপেক্ষিকভাবে এসব গুণ পেলেও পরম ও সর্বদিক-পূর্ণ সামাদ একমাত্র আল্লাহ; আর এই অমুখাপেক্ষিতা থেকেই অনিবার্যভাবে আসে তাঁর একত্ব ও একমাত্র মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা [১]। আর তাই পরের আয়াতে যখন বলা হয় তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি-সেটি যেন এই সামাদ-গুণেরই স্বাভাবিক পরিণতি; যিনি অমুখাপেক্ষী ও চিরন্তন, তাঁর তো সন্তানেরও প্রয়োজন নেই, পিতারও নয় [৪][৬]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
সামাদ মানে কী-একদম সহজ করে বললে?
কল্পনা করুন এক গভীর রাতে গোটা গ্রাম পিপাসার্ত; সবাই ছুটে যাচ্ছে একটিমাত্র অফুরান ঝরনার দিকে, অথচ ঝরনাটির নিজের কারও কাছ থেকে কিছু নেওয়ার নেই। সামাদ (الصمد) ঠিক তেমনই-সেই সত্তা যাঁর কাছে সব সৃষ্টি নিজের প্রয়োজনে আশ্রয় নেয়, আর তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন । তাফসিরবিদ আলী ও ইকরিমা বলেন, তিনিই সেই সত্তা যাঁর কাছে সবাই প্রয়োজন পূরণের জন্য হাজির হয় । মুখতাসারে এসেছে, গোটা সৃষ্টিজীব তাঁরই মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারও নন । অর্থাৎ অভাব মানুষের দিকে, পূর্ণতা একমাত্র তাঁর দিকে।
সামাদ শব্দটির এত আলাদা আলাদা অর্থ কেন এসেছে?
মূলত শব্দটির ভাষাগত গভীরতাই এর কারণ। যামাখশারী ও আল-বিকাঈ দেখান, সামাদ এসেছে ‘সামাদা ইলাইহি’ (صمد إليه) থেকে, যার অর্থ কারও দিকে অভিপ্রায় করা-তাই এটি সেই সরদার যাঁর দিকে অভিমুখ হওয়া হয় । আবার ‘সামাদ’ মানে নিরেট-কঠিন, যার ভেতরে শূন্যতা নেই; এ থেকে অর্থ এসেছে-যাঁর উদর নেই, যিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী নন । আবু বকর যাকারিয়া মীমাংসা টানেন-এই সব অর্থই নির্ভুল, কারণ প্রকৃত ও পূর্ণ সামাদ একমাত্র আল্লাহ, যাঁর প্রতিটি অর্থই তাঁর মধ্যে পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান ।
আগের আয়াতে ‘আহাদ’ বলার পর আবার ‘সামাদ’ বলার দরকার কী ছিল?
আল-বিকাঈ এর সূক্ষ্ম সমন্বয় তুলে ধরেন। আহাদ (أحد) হলো একত্বের ঘোষণা-বিভাজন ও সমকক্ষ থেকে পবিত্রতা; আর সামাদ যেন সেই একত্বের জীবন্ত প্রমাণ ও ফলাফল, তাই দুই বাক্যের মাঝে কোনো সংযোজক রাখা হয়নি । আবু বকর যাকারিয়াও বলেন, যিনি সামাদ তাঁর একক হওয়া অনিবার্য, কারণ একাধিক সত্তা একসঙ্গে সবার অমুখাপেক্ষী ও সবার প্রয়োজন পূরণকারী হতে পারে না । সুতরাং আহাদ যা ঘোষণা করল, সামাদ তা প্রমাণ করল।
সামাদ নাম থেকে কি আল্লাহর ইবাদতের যোগ্যতা প্রমাণিত হয়?
হ্যাঁ, আবু বকর যাকারিয়া এটি স্পষ্ট করেন। মানুষ স্বভাবতই তারই ইবাদত করে যার কাছে সে নিজের প্রয়োজনে হাত পাতে; আর যার প্রয়োজন পূরণের সামর্থ্যই নেই, কোনো সচেতন মানুষ তার ইবাদত করতে পারে না । যেহেতু একমাত্র আল্লাহই সামাদ-সবার অভাব পূরণকারী ও কারও অমুখাপেক্ষী-তাই একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য । আল-বিকাঈও বলেন, সবার পরম মুখাপেক্ষিতা ও তাঁর পরম অমুখাপেক্ষিতা এটাই দাবি করে যে একমাত্র তিনিই ইবাদতের অধিকারী, তাঁর কোনো শরিক নেই ।
সৃষ্টির কেউ কি কোনোভাবে ‘সামাদ’ হতে পারে?
আবু বকর যাকারিয়া এর সুন্দর জবাব দেন। সৃষ্টি যদি কোনো এক দিক দিয়ে সামাদ হয়েও থাকে, অন্য দিক দিয়ে তা সামাদ নয়-কারণ সে অবিনশ্বর নয়, একদিন তার বিনাশ হবে । কোনো নেতার নেতৃত্ব আপেক্ষিক, নিরঙ্কুশ নয়; কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেও তার চেয়েও শ্রেষ্ঠ আরেকজন থেকে যায়; কেউ কারও কিছু প্রয়োজন মেটালেও সবার সব প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য কারও নেই । তাই পরম ও সর্বদিক-পূর্ণ সামাদ একমাত্র আল্লাহ-তিনি রিজিক দেন, নেন না; চিরন্তন, অজেয়, অক্ষয় ।
পরের আয়াত ‘তিনি জন্ম দেননি, জন্মগ্রহণও করেননি’-এর সঙ্গে সামাদের সম্পর্ক কোথায়?
ইবন কাসীর ও যামাখশারী এই যোগসূত্র খোলেন। যে জন্মগ্রহণ করে, সে সৃষ্ট, দেহধারী ও নশ্বর; অথচ আল্লাহ চিরন্তন, যাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই । আর জন্ম দেওয়ার জন্য সমজাতীয় সঙ্গিনী প্রয়োজন, যা থেকে তিনি পবিত্র । ইকরিমা থেকে বর্ণিত সামাদের একটি অর্থই হলো-যাঁর থেকে কিছু বের হয় না, অর্থাৎ যিনি কাউকে জন্ম দেন না । তাই পরের আয়াত যেন এই সামাদ-গুণেরই ব্যাখ্যা-অমুখাপেক্ষী ও চিরন্তন সত্তার সন্তানেরও প্রয়োজন নেই, পিতারও নয় ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
আগের আয়াতে আল্লাহকে ‘সামাদ’ বলার পর এখানে সেই অমুখাপেক্ষিতারই অনিবার্য দাবি ফুটে ওঠে, لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُوۡلَدۡ, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি । যারা আল্লাহর বংশপরিচয় জানতে চেয়েছিল, এ যেন তাদেরই জবাব; কেননা সন্তান জন্ম দেওয়া সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য, স্রষ্টার নয় । তাই তিনি কারও সন্তান নন, আর তাঁরও কোনো সন্তান নেই । ইবনে কাসীর সূক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দেন, ‘লাম ইউলাদ’ অর্থ যিনি সৃষ্ট নন; কারণ যা সৃষ্ট হয় তা একদিন মরে এবং অন্যেরা তার উত্তরাধিকারী হয়, কিন্তু আল্লাহ অবিনশ্বর, তাঁর কোনো উত্তরাধিকারীও নেই । এই এক বাক্যে একদিকে খণ্ডিত হয় ইহুদি-খ্রিস্টানদের ‘আল্লাহর পুত্র’ দাবি, অন্যদিকে অস্বীকৃত হয় তাঁর কোনো উৎস বা জনক থাকার কল্পনা ।
মুশরিকরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আল্লাহর বংশ ও পরিচয় জানতে চেয়েছিল, তখন গোটা সূরার সঙ্গে এ আয়াতও সেই প্রশ্নের জবাবে নাযিল হয় । পাশাপাশি এটি ইহুদিদের উযায়ের ও খ্রিস্টানদের ঈসাকে ‘আল্লাহর পুত্র’ বলার ভ্রান্তিরও জবাব ।
দুই দিক থেকে অস্বীকৃতির ভঙ্গিতেই অলংকার। জালালাইন দেখান, ‘লাম ইয়ালিদ’ (জন্ম দেননি) এসেছে তাঁর সমজাতীয় কিছু থাকার অস্বীকৃতিতে, আর ‘লাম ইউলাদ’ (জন্ম নেননি) এসেছে তাঁর সূচনা বা আদিযুক্ততার অস্বীকৃতিতে । অর্থাৎ একটি বাক্যেই ঊর্ধ্ব ও অধঃ, উভয় দিকের সম্পর্ক কেটে দেওয়া হয়েছে; না তাঁর কোনো শাখা আছে, না কোনো মূল ।
আগের আয়াতে ‘সামাদ’ বলে জানানো হয়েছিল আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী; এ আয়াত সেই অমুখাপেক্ষিতাকেই দৃঢ় করে, কারণ সন্তান বা জনক থাকা মানেই অভাব, ভাগ ও বিনশ্বরতা, যা সামাদের সঙ্গে যায় না । আর পরের আয়াত وَلَمۡ يَكُنۡ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ এসে এই অস্বীকৃতিকে পূর্ণতা দেয়, কেবল সন্তান-জনক নয়, কোনো সমকক্ষও তাঁর নেই । ফলে ‘আহাদ → সামাদ → জন্মহীনতা → সমকক্ষহীনতা’, এই ধারায় সমস্ত প্রকার অংশীদারিত্বের শিকড় কেটে যায় ।
ভাবুন, কেউ আল্লাহর বংশ-পরিচয় জানতে চাইছে, যেমন মানুষের বাবা-দাদা থাকে। উত্তরে এল, তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। সন্তান হওয়া তো সৃষ্টির ধর্ম, যে জন্মায় সে বাড়ে, বুড়ো হয়, মরে, আর রেখে যায় উত্তরাধিকারী; কিন্তু আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর শুরুও নেই, শেষও নেই [১][৪]। আগের আয়াতের ‘সামাদ’ যে অমুখাপেক্ষী সত্তার কথা বলেছিল, এ আয়াত তারই স্বাভাবিক পরিণতি, কারণ যাঁর সন্তান বা জনক থাকে তাঁর অভাব ও নির্ভরতা থাকে; আর পরের আয়াত মিলিয়ে দাঁড়ায় পূর্ণ ঘোষণা, তাঁর সন্তান নেই, জনক নেই, সমকক্ষও নেই, তিনি প্রকৃত অর্থেই এক [৩][৪]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
আয়াতটি একটি সহজ দৃশ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিন।
মানুষের পরিচয় জানতে আমরা বাবা-দাদার নাম জিজ্ঞেস করি। মক্কার মুশরিকরাও নবীর কাছে আল্লাহর তেমন বংশ-পরিচয় চেয়েছিল । জবাবে এল এক চমকপ্রদ উত্তর, তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি । অর্থাৎ প্রশ্নের কাঠামোটাই খাটে না; জন্ম-জন্মান্তর তো সৃষ্টির গল্প, স্রষ্টার নয়। যিনি সবকিছুর উৎস, তাঁর নিজের কোনো উৎস থাকতে পারে না, আর যিনি চিরস্থায়ী, তাঁর কোনো উত্তরসূরিরও দরকার নেই ।
‘জন্ম দেননি’ ও ‘জন্ম নেননি’, দুটো আলাদা করে বলার দরকার কী ছিল?
কারণ সম্পর্কের দুটি দিকই বন্ধ করা উদ্দেশ্য। ‘জন্ম দেননি’ অস্বীকার করে তাঁর কোনো সন্তান বা শাখা থাকার কল্পনা, আর ‘জন্ম নেননি’ অস্বীকার করে তাঁর কোনো জনক বা উৎস থাকার ধারণা । জালালাইনের ভাষায়, প্রথমটি তাঁর সমজাতীয় কিছু থাকার অস্বীকৃতি, দ্বিতীয়টি তাঁর আদিযুক্ত বা সৃষ্ট হওয়ার অস্বীকৃতি । দুই অস্বীকৃতি মিলে আল্লাহকে সব ধরনের বংশ-শৃঙ্খল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত প্রমাণ করে ।
এই আয়াত কোন কোন ভ্রান্ত বিশ্বাসের জবাব দেয়?
এটি সরাসরি খণ্ডন করে ‘আল্লাহর সন্তান আছে’ এই ধরনের সব দাবি, যেমন ইহুদিদের উযায়েরকে ও খ্রিস্টানদের ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলা । যাকারিয়ায় এসেছে, এটি মূলত সেই মুশরিকদের জবাব যারা আল্লাহর বংশপরিচয় জানতে চেয়েছিল । সন্তান-জনকের ধারণা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য; স্রষ্টার সঙ্গে তা জুড়ে দেওয়া তাঁর মহিমার পরিপন্থী, তাই কুরআন এক বাক্যেই এ ভ্রান্তি উপড়ে ফেলে ।
সন্তান জন্ম দেওয়া কেন স্রষ্টার নয়, সৃষ্টিরই বৈশিষ্ট্য?
কারণ জন্মদান অভাব ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে জড়িত। যে সন্তান চায়, সে নিজের অসম্পূর্ণতা পূরণ করতে বা বংশ টিকিয়ে রাখতে চায়; আর যে জন্মায়, সে একসময় মরে ও উত্তরসূরি রেখে যায় । আল্লাহ এসব থেকে পবিত্র, তিনি অমুখাপেক্ষী ও চিরঞ্জীব । তাই সন্তান বা জনক থাকা সৃষ্টিরই ধর্ম, স্রষ্টার নয়; এ আয়াত সেই সীমারেখা স্পষ্ট করে দেয় ।
আগের আয়াত ‘সামাদ’-এর সঙ্গে এ আয়াতের সম্পর্ক কী?
গভীর সম্পর্ক। ‘সামাদ’ মানে সেই অমুখাপেক্ষী সত্তা, যাঁর প্রতি সবাই মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারও নন । সন্তান বা জনক থাকা মানেই কোনো না কোনো নির্ভরতা ও অভাব, যা সামাদিয়্যাতের বিপরীত; তাই ‘সামাদ’ বলার পরপরই ‘জন্ম দেননি, জন্ম নেননি’ এসে সেই অমুখাপেক্ষিতাকে নিশ্চিত করে । এরপর পরের আয়াত ‘সমকক্ষ কেউ নেই’ যোগ করে তাওহীদের ছবি পূর্ণ করে তোলে ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
সূরা ইখলাসের শেষ আয়াত ﴿وَلَمۡ يَكُنۡ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ﴾ ঘোষণা করে-তাঁর সমতুল্য, সমকক্ষ বা সদৃশ কেউ নেই। কুফু (كُفُو) শব্দের অর্থ নজির, সদৃশ, সমান ও সমমর্যাদাসম্পন্ন; তাই অর্থ দাঁড়ায়, সারা বিশ্বজাহানে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, কর্ম ও ক্ষমতার ব্যাপারে তাঁর সমান পর্যায়ে কেউ কোনোদিন ছিল না, নেই, হবেও না, এমনকি আকার-আকৃতিতেও কেউ তাঁর সাদৃশ্য রাখে না । মুখতাসারে সংক্ষেপে বলা হয়েছে-তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর কোনো সমতুল্য নেই । ইবনে কাসীর যুক্তি তুলে ধরেন-যে সৃষ্ট হয় সে একদিন মৃত্যুবরণ করে ও তার উত্তরাধিকারী হয়; কিন্তু আল্লাহ মৃত্যুবরণও করেন না, তাঁর উত্তরাধিকারীও কেউ নয়, তিনি কারো সন্তান নন এবং তাঁর সমতুল্যও কেউ নেই । জালালাইন ব্যাকরণগত সূক্ষ্মতা দেখান-কুফুয়ান (كُفُوًا) মানে সমকক্ষ ও সদৃশ; لَهُ শব্দটি কুফুয়ান-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত, আর একে আগে আনা হয়েছে কারণ অস্বীকারের মূল লক্ষ্যবিন্দু এটিই, এবং فاصلة তথা শেষাক্ষরের ছন্দ রক্ষার্থে أحَد পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে । যামাখশারী ও বিকাঈ একই কথা বলেন-এই বাক্যের মূল উদ্দেশ্যই আল্লাহর সত্তা থেকে সমকক্ষতা ও সমতা অস্বীকার করা, তাই সেই অর্থকেন্দ্রিক ظرف-কে সামনে আনা সর্বাধিক বলিষ্ঠ ফাসীহ রীতি । বিকাঈর মতে এই তিন আয়াত মিলে সামাদিয়্যাতেরই ব্যাখ্যা, যা সব রকম সাদৃশ্য নাকচ করে ।
শানে নুযূল হিসেবে সূত্রগুলোতে এসেছে, মুশরিক কুরাইশরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিল-"হে মুহাম্মদ! আমাদের কাছে তোমার প্রতিপালকের গুণ-পরিচয় বর্ণনা করো," তখন আল্লাহ পুরো সূরা ইখলাস নাজিল করেন । ইবনে কাসীর আরও উল্লেখ করেন, ইহুদিরা উযায়রকে ও খ্রিষ্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলত, মাজুসীরা চন্দ্র-সূর্য এবং মুশরিকরা মূর্তিপূজা করত-এসবের জবাবেই এই সূরা ।
এ আয়াতের সবচেয়ে আলোচিত বালাগাত হলো শব্দবিন্যাস তথা তাকদীম-তাখীর: ظرف লَهُ কুফুয়ান-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েও তার আগে আনা হয়েছে, কারণ আয়াতের মূল লক্ষ্য আল্লাহর সত্তা থেকে সমকক্ষতা অস্বীকার-তাই সেই অর্থকেন্দ্রকেই সামনে আনা হয়েছে, আর أحَد (যা كان-এর ইসম) পিছিয়ে এসেছে فاصلة তথা আয়াত-শেষের ধ্বনিছন্দ রক্ষার্থে । যামাখশারী সিবাওয়াইহির আপত্তির জবাবে বলেন-যদিও সচরাচর লগব ظرف পিছিয়ে রাখা ফাসীহ, এখানে সামনে আনাই সর্বাধিক বলিষ্ঠ, কেননা এই ظرف-ই বাক্যের কেন্দ্রবিন্দু । বিকাঈ দেখান, এই তিন আয়াত যেন একক একটি বাক্যের মতো সামাদিয়্যাতের ব্যাখ্যা, এবং সূরার শেষ তার শুরুর সঙ্গে অভিন্নভাবে মিলে যায়-আখির তার আউয়ালের সঙ্গে সন্ধিস্থলে আঁটসাঁট জোড়ার মতো মিশে গেছে ।
এ আয়াতটি সরাসরি আগের আয়াত ﴿لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُوۡلَدۡ﴾-এর যৌক্তিক চূড়ান্ত পরিণতি। বিকাঈর ব্যাখ্যায় তৃতীয় ও চতুর্থ এ দুই আয়াত আগের সামাদ-বাক্যের উপর সংযুক্ত (معطوف), কারণ এ তিনটি মিলে সামাদিয়্যাতেরই বিশ্লেষণ, যা সব রকম সাদৃশ্যকে নাকচ করে-তাই তিনটি যেন একই বাক্য । জন্ম দেওয়া ও জন্ম নেওয়া অস্বীকার করার মানে তাঁর কোনো জাতি, প্রজাতি বা সঙ্গিনী নেই; আর জাতি-প্রজাতি না থাকলে সমতুল্যও থাকতে পারে না-তাই কুফু-র অস্বীকার আগের আয়াতের অনিবার্য ফল । ইবনে কাসীরও এ আয়াতকে আগেরগুলোর সঙ্গে এক সুতোয় গাঁথেন: যিনি জন্ম দেন না, কারো সন্তান নন, তাঁর সমতুল্যও কেউ নয় । যেহেতু এটিই সূরার শেষ আয়াত, পরের কোনো আয়াত নেই; বিকাঈ বলেন এখানে সূরার শেষ তার সূচনার (هُوَ اللَّهُ أحَدٌ) সঙ্গে পূর্ণ বৃত্ত রচনা করে মিলে যায় ।
পুরো সূরাটি এসেছিল একটি প্রশ্নের জবাবে-মুশরিকরা চেয়েছিল আল্লাহর একটা বংশ-পরিচয়, যেন তিনিও তাদের কল্পিত দেবতাদের মতো জাতিভুক্ত, সঙ্গীসাথিওয়ালা, সন্তানসন্ততিওয়ালা কেউ [৪][৬][৭]। সূরা শুরু হয়েছিল 'তিনি আল্লাহ, এক' দিয়ে, এরপর 'সামাদ'-যাঁর কাছে সবাই মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; তারপর বলা হলো তিনি জন্ম দেন না, জন্ম নেনও না। আর এই শেষ আয়াত সেই সবকিছুকে একটি অমোঘ সিলমোহরে আবদ্ধ করে দেয়: তাঁর সমতুল্য, সমকক্ষ, সদৃশ কেউ নেই-সত্তায় নয়, গুণে নয়, কর্মে নয়, এমনকি আকার-আকৃতিতেও নয় [১][২][৪]। যুক্তিটা সহজ ও অনিবার্য-যে জন্ম নেয় সে সৃষ্ট, আর যে সৃষ্ট সে একদিন মরবে ও তার উত্তরাধিকারী রেখে যাবে; কিন্তু আল্লাহ মরেন না, তাঁর উত্তরাধিকারীও নেই, তাই তাঁর সমকক্ষও থাকতে পারে না [৪]। আগের আয়াত থেকে এ আয়াতে আসাটা তাই একটানা একটা সুর-জন্ম-জন্মান্তরের অস্বীকার এসে মিলেছে সমতার সম্পূর্ণ অস্বীকারে [৭]। ভাষাও সেই কথাকেই জোর দেয়: 'তাঁর জন্য' কথাটিকে ইচ্ছে করে সামনে এনে দেওয়া হয়েছে, কারণ অস্বীকারের তীর ঠিক সেখানেই বিঁধছে-অন্য কারো সঙ্গে তাঁকে কোনো তুলনাই চলে না [৫][৬][৭]। আর এভাবেই সূরার শেষ তার শুরুর সঙ্গে বৃত্ত পূর্ণ করে: যিনি 'এক', তাঁর সত্যিকারের অর্থই হলো তাঁর কোনো দ্বিতীয় নেই [৭]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
আয়াতটি একদম সহজ করে কীভাবে বুঝব?
কল্পনা করুন কেউ একজন শিল্পীর পরিচয় জানতে চাইল-তার বংশ, তার সমকক্ষ আর কারা। জবাবে বলা হলো, এই শিল্পীর মতো দ্বিতীয় কেউ নেই; কেউ তাঁর সমান নয়, কেউ তাঁর সদৃশও নয়। ঠিক এভাবেই মুশরিকরা যখন আল্লাহর বংশ-পরিচয় চাইল, জবাব এলো-তাঁর সমতুল্য, সমকক্ষ কেউই নেই । কুফু (كُفُو) মানে নজির, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদাসম্পন্ন; অর্থাৎ সত্তায়, গুণে, কর্মে কিংবা আকার-আকৃতিতে-কোনো দিক থেকেই কেউ তাঁর সমান পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না, পারবেও না ।
'কুফু' শব্দটির মানে আসলে কী?
আবু বকর যাকারিয়া বিস্তারিত বলেন, মূলে শব্দটি 'কুফু' (كُفُو), যার মানে নজির, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সমতুল্য । জালালাইনে এর ব্যাখ্যা-মুকাফিআন (مُكافِئًا) তথা সমকক্ষ এবং মুমাসিলান (مُماثِلًا) তথা সদৃশ । তাই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়-না তাঁর সত্তায়, না গুণাবলিতে, না কর্মাবলিতে । আহসানুল বায়ান এর সমর্থনে কুরআনের আরেক আয়াত আনে-'তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই' (সূরা শুরা ৪২:১১) । সব মিলিয়ে শব্দটি সম্পূর্ণ, সর্বব্যাপী সাদৃশ্য-অস্বীকার বহন করে।
আগের আয়াতে জন্ম দেওয়া-নেওয়া অস্বীকার করার পরও আবার সমতুল্য না থাকার কথা কেন?
এ যেন একটি যুক্তির ধাপে ধাপে চূড়ান্ত পরিণতি। বিকাঈ দেখান, কুফু থাকার অর্থ হতো আল্লাহর কোনো জাতি ও শ্রেণি (جنس وفصل) আছে, আর তখন তাঁর অস্তিত্ব হতো জোড়া থেকে উৎপন্ন-যেখানে জাতি যেন মাতা, শ্রেণি যেন পিতা । কিন্তু আগেই প্রমাণিত হয়েছে তাঁর ক্ষেত্রে কোনো জন্মই চলে না, কারণ তাঁর অস্তিত্ব নিজ সত্তার দাবিতে অপরিহার্য (واجب الوجود) । তাই জন্ম অস্বীকারের পর সমতুল্য-অস্বীকার আসা নিছক পুনরাবৃত্তি নয়, বরং পূর্ববর্তী সত্যেরই অনিবার্য ও দৃঢ় নিশ্চিতকরণ ।
'লাহু' শব্দটিকে আগে আনার মধ্যে বিশেষ কোনো অলংকার আছে কি?
হ্যাঁ, এটিই এ আয়াতের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বালাগাত। জালালাইন বলেন, লাহু (لَهُ) সম্পৃক্ত কুফুয়ান-এর সঙ্গে, কিন্তু তাকে আগে আনা হয়েছে কারণ অস্বীকারের মূল লক্ষ্যবিন্দু এটিই, আর أحَد পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে আয়াত-শেষের ধ্বনিছন্দ (فاصلة) রক্ষার্থে । যামাখশারী এক চমৎকার প্রশ্ন তোলেন-সিবাওয়াইহির মতে তো লগব ظرف পিছিয়ে রাখাই ফাসীহ, তবে এখানে সামনে কেন? উত্তরে বলেন, এ বাক্যের সমগ্র উদ্দেশ্যই আল্লাহর সত্তা থেকে সমতা অস্বীকার, আর সেই অর্থের কেন্দ্রই এই ظرف-তাই সামনে আসার সর্বাধিক যোগ্য সে ।
আল্লাহর সমতুল্য কেউ নেই-এ কথাটি কুরআনের আর কোথাও আছে কি?
আছে, এবং তাফসিরকাররা সেগুলো টেনে এনে আয়াতটিকে আলোকিত করেন। আহসানুল বায়ান উদ্ধৃত করে সূরা শুরার আয়াত-'তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই' (৪২:১১) । আবু বকর যাকারিয়া সন্তান-অস্বীকার প্রসঙ্গে আনেন সূরা নিসা ১৭১, সাফফাত ১৫১-১৫২, যুখরুফ ১৫, আনআম ১০০-১০১, আম্বিয়া ২৬ ও ইসরা ১১১-সবগুলো মিলে যেন সূরা ইখলাসের বিস্তৃত ব্যাখ্যা । ইবনে কাসীরও আনেন আনআম ১০১, মারইয়াম ৮৮-৯৫ ও আম্বিয়া ২৬-২৭-দেখাতে যে সব কিছুর স্রষ্টা ও মালিকের সমকক্ষতার দাবি করার মতো কেউই থাকতে পারে না ।
এই ছোট সূরাটিকে কেন কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান বলা হয়?
ইবনে কাসীর বহু হাদিস উদ্ধৃত করেন যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সূরা ইখলাস কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য । কারণ হিসেবে যামাখশারী ও বিকাঈ ব্যাখ্যা দেন-সংক্ষিপ্ত হলেও এ সূরা আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, তাওহিদ ও ন্যায়বিচার ধারণ করে, তাই একে 'সূরাতুল আসাস' তথা মূলনীতির সূরা বলা হয় । বিকাঈ যোগ করেন, দ্বীন তিন স্তম্ভে দাঁড়িয়ে-বিশ্বাস, বিশ্বাসের অনুবাদক ভাষাকর্ম, ও তা যাচাইকারী কর্ম; এ সূরা বিশ্বাসের শিরোভাগ তাওহিদকে পূর্ণরূপে ধারণ করায় এক-তৃতীয়াংশের সমান ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
আল-ফালাকالفلق
▶তাফসীর সামারি
এই আয়াত দিয়ে সূরা আল-ফালাক শুরু হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশে-“বলুন”-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং তাঁর মাধ্যমে প্রতিটি মানুষকে শেখানো হচ্ছে কীভাবে আশ্রয় চাইতে হয় । ‘আউযু’ (أعوذ) মানে আমি আশ্রয় নিচ্ছি, আত্মরক্ষা করছি, একজনের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি । মুমিন যখনই কোনো অনিষ্টের ভয় পায়, তার স্বভাব হলো আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাওয়া-অন্য কারো কাছে নয়, নিজের শক্তির ওপরও ভরসা নয় । আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে রবের কাছে-‘রব’ (رب) মানে যিনি লালন-পালন করেন, সৃষ্টি করেন ও পরিচালনা করেন। আর তাঁকে এখানে পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘ফালাক’-এর রব বলে । ‘ফালাক’ (الفلق) শব্দের মূল অর্থ ফেটে যাওয়া, চিরে বের হওয়া । সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও বহুল-গৃহীত মত-ইমাম বুখারী ও ইবনে জারীরের মতে-এর অর্থ প্রভাত বা ঊষা, কারণ রাতের অন্ধকার চিরে আলো বেরিয়ে আসে । আরেক মত-এটি সমস্ত সৃষ্টি, কেননা আল্লাহ অন্ধকারের আবরণ চিরে গাছ, ঝরনা, শিশু, বৃষ্টি-সবকিছু বের করে আনেন । ইমাম তাবারীর মতে আয়াতটি ব্যাপক রাখা হয়েছে, তাই চিরে বের-হওয়া সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত । যিনি অন্ধকার চিরে আলো আনতে পারেন, তিনিই ভয় ও আতঙ্ক দূর করে আশ্রয়প্রার্থীকে নিরাপত্তা দিতে পারেন ।
তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া ও ইবনে কাসীর-এ বর্ণিত আছে যে সূরা ফালাক ও সূরা নাস একই ঘটনায় একসঙ্গে নাযিল হয়। জনৈক ইহুদি (লাবীদ ইবন আ‘সাম) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর জাদু করেছিল-চিরুনি ও চুলে গ্রন্থি বেঁধে ‘যরওয়ান’ কূপে রেখেছিল-যাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম স্বপ্নযোগে বিষয়টি জানালে গ্রন্থিগুলো কূপ থেকে উদ্ধার করা হয়, আর এই দুই সূরা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে এক একটি গ্রন্থি খুলে যেতে থাকে ও তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হন । উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল এই দুই সূরাকে অতুলনীয় বলে অভিহিত করেছেন এবং প্রতি সালাতের পর ও শোয়ার সময় পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন ।
আয়াতের সূচনা ‘কুল’ (قل) অর্থাৎ “বলুন” দিয়ে-যা সরাসরি আদেশ; এর মধ্য দিয়ে নির্দেশটি শুধু রাসূলের নয়, যার কাছেই এই বাণী পৌঁছবে সেই প্রতিটি সৃষ্টির জন্য শিক্ষা ও আদেশ হিসেবে এসেছে । ‘আউযু বিরব্বিল ফালাক’-এখানে আশ্রয়ের জন্য বহু সিফাতের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘রুবূবিয়্যাত’ তথা রবের গুণটি, কারণ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করাই হলো সর্বোচ্চ লালন-পালন-তাই এই সিফাতটিই এখানে সবচেয়ে যথোপযুক্ত । ‘ফালাক’ শব্দটি ‘ফা‘আল’ ওজনে কিন্তু ‘মাফ‘ঊল’-এর অর্থে, অর্থাৎ ‘যা ফাটানো হয়েছে’ । অন্ধকার চিরে আলো বের করার প্রতিচ্ছবিতে আশ্রয়দাতার সামর্থ্যের ইঙ্গিত-যিনি আঁধার চিরতে পারেন, তিনি ভয়ও চিরে দিতে পারেন ।
এটি সূরার প্রথম আয়াত, তাই পূর্ববর্তী কোনো আয়াত নেই; তবে আল-বিকাঈ দেখান যে গোটা কুরআন যেভাবে সূরা ফাতিহার ‘ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা‘ঈন’ (কেবল তোমারই ইবাদত করি ও তোমারই সাহায্য চাই) দিয়ে শুরু হয়েছিল, শেষেও এই আশ্রয়-প্রার্থনা সেই সূচনার সঙ্গে মিলে যায়-সফরের শেষে যেন যাত্রী আবার আপন ঠিকানায় ফেরে । সূরা ইখলাসে তাওহীদ পূর্ণতা পাওয়ার পর স্বাভাবিক পরিণতি হলো একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই দিকে ঝুঁকে পড়া ও তাঁরই আশ্রয় নেওয়া । পরবর্তী আয়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ: প্রথমে কার কাছে আশ্রয় তা স্পষ্ট হলো-‘ফালাক-এর রব’; এরপরের আয়াত ‘মিন শাররি মা খালাক’ বলে দিচ্ছে কিসের অনিষ্ট থেকে-“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে” । আল-বিকাঈর মতে এখানে প্রথমে এমন অনিষ্টের কথা আনা হয়েছে যা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নির্বিশেষে জিন ও মানুষ-শয়তান সবাইকে ব্যাপ্ত করে ।
কল্পনা করুন গভীর রাত-চারদিকে আঁধার, মনে নানা শঙ্কা। তখন মানুষ অপেক্ষায় থাকে কখন প্রভাতের আলো এসে অন্ধকার চিরে দেবে। ঠিক এই দৃশ্যকেই আল্লাহ আশ্রয়ের পাঠ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি বলছেন: “বলুন, আমি আশ্রয় নিচ্ছি প্রভাতের রবের কাছে।” ‘ফালাক’ (الفلق) শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ফেটে যাওয়া, চিরে বের হওয়ার ছবি-রাতের পর্দা চিরে যেমন ভোর বেরিয়ে আসে [১], বীজের বুক চিরে গাছ, মেঘ চিরে বৃষ্টি, গর্ভের আবরণ চিরে শিশু [১][৬][৭]। বহু মুফাসসির, বিশেষত ইমাম বুখারী ও ইবনে জারীরের মতে এর প্রসিদ্ধ অর্থ প্রভাত [১][৪][৫][৬], আবার কেউ এর ব্যাপক অর্থ নিয়েছেন-আল্লাহ যা কিছু অন্ধকার চিরে সৃষ্টি করেছেন তার সবই [১][৭]। আর আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে ‘রব’ (رب)-এর কাছে, কারণ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করাই তো সবচেয়ে বড় লালন [৭]। যিনি প্রতিদিন আঁধার ভেঙে আলো আনেন, তিনিই তো ভয়ের আঁধার ভেঙে নিরাপত্তার ভোর আনতে পারেন [২]। তাই বিপদের প্রথম মুহূর্তেই বান্দা যেন অন্য কারো কাছে নয়, নিজের সামর্থ্যের ওপরও নয়-সোজা মাওলার কাছে ছুটে যায় [১][৭]। আর এখানে আশ্রয়দাতাকে চিনিয়ে দেওয়ার পর পরের আয়াত খুলে দেবে আশ্রয় চাওয়ার বিষয়-“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে” [৬][৭]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
আয়াতটি সহজ করে বুঝতে চাই-একটি দৈনন্দিন দৃশ্যের মাধ্যমে বলবেন?
একটি ছোট্ট শিশু রাতের অন্ধকারে ভয় পেলে যেমন দৌড়ে গিয়ে বাবার বুকে আশ্রয় নেয়, তেমনি মানুষও যখন কোনো অনিষ্টের ভয় পায়, তার স্বভাব হওয়া উচিত সরাসরি আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া । আর আল্লাহকে এখানে পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘ফালাক’ অর্থাৎ প্রভাতের রব বলে-যিনি প্রতিদিন রাতের গাঢ় আঁধার চিরে ভোরের আলো নিয়ে আসেন । ভাবুন, রাতভর শঙ্কায় থাকা মানুষ যেমন ভোরের অপেক্ষায় থাকে, তেমনি ভীত বান্দা আশ্রয় চেয়ে নিরাপত্তার প্রভাত উদয়ের আশায় থাকে । যিনি প্রতিদিন আঁধার ভাঙতে পারেন, তিনিই ভয় ভাঙতে পারেন।
‘ফালাক’ শব্দের অর্থ নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে কোন কোন মত আছে?
‘ফালাক’ (الفلق)-এর মূল অর্থ ফাটানো বা চিরে ফেলা । সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও বহুল-গৃহীত মত-যা ইমাম বুখারী ও ইবনে জারীর গ্রহণ করেছেন-এর অর্থ প্রভাত বা ঊষা, কারণ রাতের অন্ধকার চিরে আলো বেরিয়ে আসে । দ্বিতীয় মত: এর অর্থ সমগ্র সৃষ্টি, কেননা আল্লাহ অন্ধকারের আবরণ চিরে গাছ, ঝরনা, শিশু, বৃষ্টি প্রভৃতি বের করেন । ইমাম তাবারী বলেন, আয়াতটি অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে, তাই চিরে বের-হওয়া সবকিছুই এর উদ্দেশ্য । আবার কেউ কেউ একে জাহান্নামের একটি স্থান বলেছেন, যদিও সেই বর্ণনাকে মুনকার বলা হয়েছে ।
আশ্রয় চাওয়ার জন্য আল্লাহর বহু গুণের মধ্যে ‘রব’ গুণটিকেই কেন বেছে নেওয়া হলো?
আল-বিকাঈ চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আশ্রয় চাওয়া বা ‘ই‘আযা’ (অনিষ্ট থেকে রক্ষা) আল্লাহর ‘রুবূবিয়্যাত’ তথা লালন-পালনের গুণের সঙ্গেই সবচেয়ে মানানসই । কারণ কাউকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোই হলো সবচেয়ে বড় লালন-পালন-একজন প্রকৃত প্রতিপালক তো তিনিই যিনি বিপদ থেকে তাঁর প্রতিপাল্যকে আগলে রাখেন । ‘রব’ (رب) শব্দটি একইসঙ্গে সৃষ্টি, লালন ও পরিচালনার অর্থ বহন করে। তাই যখন বান্দা ভয় থেকে আশ্রয় চায়, তখন আল্লাহকে ঠিক সেই গুণেই ডাকা হয় যে গুণ এই আশ্রয়দানের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িত ।
মুমিনের জন্য আশ্রয় চাওয়ার সঠিক রীতি এই আয়াত থেকে কী শেখা যায়?
তাফসীর আবু বকর যাকারিয়ায় এসেছে যে কুরআনের নানা স্থানে নবীগণের আশ্রয়-প্রার্থনার দৃষ্টান্ত আছে-মারইয়াম বলেছিলেন তিনি দয়াময়ের আশ্রয় চান, নূহ আলাইহিস সালাম না-জানা বিষয় চাওয়া থেকে আল্লাহর পানাহ চেয়েছেন, মূসা আলাইহিস সালাম মূর্খের মতো কথা বলা থেকে আশ্রয় চেয়েছেন । এ থেকে স্পষ্ট, প্রতিটি বিপদ ও অনিষ্টের মোকাবিলায় আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাওয়া মুমিনের কাজ-অন্য কারো কাছে নয় । পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি বিমুখ হয়ে নিজের শক্তি ও কৌশলের ওপর ভরসা করাও তার রীতি নয় ; বরং বিপদের প্রথম মুহূর্তেই মাওলার দিকে ছুটে যাওয়াই তাওয়াক্কুলের পরিচয় ।
‘ফালাক’ অর্থ যদি প্রভাত হয়, তাহলে এর সঙ্গে আশ্রয় ও নিরাপত্তার সম্পর্ক কোথায়?
তাফসীর আহসানুল বায়ানে এ বিষয়ে দুটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে । প্রথমত, আল্লাহ যেমন রাতের অন্ধকার দূর করে দিনের উজ্জ্বলতা আনতে পারেন, তেমনি তিনি ভয় ও আতঙ্ক দূর করে আশ্রয়প্রার্থীকে নিরাপত্তা দিতে পারেন-অর্থাৎ আঁধার-ভাঙার সামর্থ্যই নিরাপত্তা-দানের সামর্থ্যের প্রতীক । দ্বিতীয়ত, মানুষ রাতে যেমন প্রভাতের অপেক্ষায় থাকে, তেমনি ভীত মানুষ আশ্রয়-প্রার্থনার মাধ্যমে সফলতার প্রভাত উদয়ের আশায় থাকে । আল-বিকাঈও যোগ করেন, এই দৈনিক ভোর-উদয় কিয়ামতের মহাফালাকেরও প্রতিচ্ছবি-যেদিন আল্লাহ ধ্বংসের আঁধার চিরে পুনরুত্থান ঘটাবেন; যিনি এসব পারেন, তিনি আশ্রয়প্রার্থীকে সব ভয় থেকে রক্ষাও করতে পারেন ।
আশ্রয়দাতাকে চেনানোর পরের আয়াতে কী আসছে, আর তা এই আয়াতের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত?
এই প্রথম আয়াত স্থির করে দেয় কার কাছে আশ্রয়-‘ফালাক-এর রব’; এরপরই পরের আয়াত ‘মিন শাররি মা খালাক’ বলে দেয় কিসের অনিষ্ট থেকে-“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে” । যামাখশারী ব্যাখ্যা করেন, ‘মা খালাক’ মানে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট-মানুষের পাপ-অবিচার থেকে শুরু করে হিংস্র জন্তু ও বিষাক্ত প্রাণীর ক্ষতি পর্যন্ত । আল-বিকাঈ দেখান, প্রথমে এমন ব্যাপক অনিষ্টের কথা আনা হয়েছে যা প্রকাশ্য ও গোপন উভয়ভাবে জিন ও মানুষ-শয়তান সবাইকে ব্যাপ্ত করে । অর্থাৎ আশ্রয়দাতার পরিচয়ের পরই আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি ক্রমে স্পষ্ট হতে থাকে-সাধারণ থেকে নির্দিষ্টের দিকে।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
প্রভাতের রবের কাছে আশ্রয় চাওয়ার পর সবার আগে যে অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হলো তা হলো ‘মা খালাক্ব’, অর্থাৎ তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট । এটি এক ব্যাপকার্থক বাক্য, যা সকল ক্ষতিকর সৃষ্টিকে শামিল করে, শয়তান ও তার বংশধর থেকে শুরু করে জাহান্নাম এবং যেকোনো ক্ষতিকর প্রাণী বা বস্তু । ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘শর’ (অনিষ্ট) দুই প্রকার, এক প্রত্যক্ষ বিপদ যা সরাসরি কষ্ট দেয়, দুই যা বিপদের কারণ হয়, যেমন কুফর ও শিরক । লক্ষণীয়, এখানে বলা হয়েছে ‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট’, অর্থাৎ অনিষ্টটা সৃষ্টির আচরণ বা ফলাফলে, আল্লাহর সৃষ্টিকর্মে নয়; তাঁর সৃষ্টি কল্যাণময়, অকল্যাণ আসে সৃষ্টির ভুল ব্যবহারে ।
এই বাক্যটি ‘আম’ তথা ব্যাপকার্থক; এক কথাতেই সমস্ত অনিষ্ট চলে আসে । তবু এর পরে তিনটি নির্দিষ্ট অনিষ্ট আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে (পরের আয়াতগুলোতে), যেগুলো প্রায়ই বিপদের কারণ হয়, যদিও সেগুলো এই ব্যাপক বাক্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল ।
আগের আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছিল ‘রব্বুল ফালাক্ব’ তথা প্রভাতের রবের কাছে, যিনি অন্ধকার চিরে আলো ফোটান; সেই মহান রবের কাছেই এখন সমস্ত সৃষ্ট অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হলো । এটি সাধারণ আশ্রয়, আর পরের তিন আয়াতে আসবে নির্দিষ্ট তিনটি অনিষ্ট, যেন আগে গোটা আকাশ, তারপর বিশেষ মেঘগুলো দেখিয়ে দেওয়া ।
ভাবুন, কেউ বিপদের আশঙ্কায় শক্তিশালী অভিভাবকের আশ্রয়ে যায়। বান্দাও তেমনি প্রভাতের রবের কাছে আশ্রয় নিয়ে প্রথমেই বলে, তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার সমস্ত অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করুন [১][২]। এক বাক্যেই ঢুকে পড়ে চেনা-অচেনা সব ক্ষতি, শয়তান থেকে হিংস্র জন্তু, রোগ থেকে বিষ [২][৩]। আর সুন্দর ব্যাপার হলো, অনিষ্ট বলা হয়েছে ‘সৃষ্টির’, আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের নয়, কারণ তাঁর সৃষ্টি প্রজ্ঞাময়; ক্ষতি জন্মে সৃষ্টির অপব্যবহারে [১]। এই ব্যাপক আশ্রয়ের পরেই পরের আয়াতগুলো বিশেষ কয়েকটি বিপদের নাম ধরে আশ্রয় চাইবে।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
আয়াতটি একটি সহজ উদাহরণে বুঝিয়ে দিন।
কেউ অচেনা শহরে রাতে পৌঁছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে, যেখানে সব বিপদ থেকে বাঁচা যায়। বান্দাও তেমনি প্রভাতের রবের কাছে আশ্রয় নিয়ে বলে, আপনার সৃষ্ট সবকিছুর অনিষ্ট থেকে আমাকে বাঁচান । এই এক বাক্যেই ধরা পড়ে দৃশ্য-অদৃশ্য সব ক্ষতি, কারণ ক্ষতি যেখান থেকেই আসুক, সবকিছুই তো তাঁর সৃষ্টি, আর সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণে ।
‘শর’ বা অনিষ্ট বলতে কী কী বোঝানো হয়?
ইবনুল কাইয়িমের মতে অনিষ্ট দুই প্রকার, এক যা সরাসরি কষ্ট দেয় (যেমন রোগ, হিংস্র প্রাণী), দুই যা বিপদের কারণ হয় (যেমন কুফর ও শিরক, যা পরকালের ধ্বংস ডেকে আনে) । আহসানুল বায়ানে বলা হয়েছে, এতে শয়তান ও তার বংশধর, জাহান্নাম এবং ক্ষতিকর সবকিছু শামিল । তাই বাক্যটি ছোট হলেও এর আশ্রয়ের ছায়া বিশাল।
‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট’ বলা হলো, ‘তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট’ নয় কেন?
এটি একটি সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। অনিষ্টকে সৃষ্ট বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে নয় । কারণ আল্লাহর সৃষ্টি প্রজ্ঞা ও কল্যাণে পূর্ণ; অকল্যাণ জন্ম নেয় সৃষ্টির আচরণে বা অপব্যবহারে। বিষ আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু তা প্রাণ বাঁচাতেও লাগে, প্রাণ নিতেও পারে; অনিষ্টটা তার ব্যবহারে । এ ভাষা আল্লাহর প্রজ্ঞাকে নিষ্কলুষ রাখে।
একটি ব্যাপক বাক্যই তো যথেষ্ট ছিল, পরে আবার নির্দিষ্ট অনিষ্টের কথা কেন?
‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট’ বললেই সব অনিষ্ট চলে আসে; এ বাক্যই আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল । তবু এর পরে তিনটি নির্দিষ্ট অনিষ্ট, রাতের অন্ধকার, জাদু ও হিংসা, আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ এগুলো বিশেষভাবে ও প্রায়ই বিপদের কারণ হয় । সাধারণের পরে বিশেষকে আনা গুরুত্ব ও সতর্কতা বাড়ায়, যেন গুরুত্বপূর্ণ বিপদগুলো আলাদা মনোযোগ পায়।
এই আয়াত আমাদের আশ্রয়প্রার্থনার কী শিক্ষা দেয়?
এটি শেখায়, প্রকৃত আশ্রয় কেবল সৃষ্টির স্রষ্টার কাছেই। যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তো সেই সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে বাঁচাতে সক্ষম । মানুষ অসংখ্য দৃশ্য-অদৃশ্য বিপদের মাঝে বাস করে, যার সব সে চেনেও না; তাই সব সৃষ্ট অনিষ্টকে এক বাক্যে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
ব্যাপক অনিষ্টের কথা বলার পর এখানে প্রথম নির্দিষ্ট অনিষ্টের নাম এলো, ‘গাসিক্ব ইযা ওয়াক্বাব’, অর্থাৎ অন্ধকার রাত যখন গভীর হয়ে ছেয়ে যায় । ‘গাসিক্ব’ অর্থ অন্ধকার বা রাত্রি, আর ‘ওয়াক্বাব’ অর্থ অন্ধকার পূর্ণরূপে বেড়ে যাওয়া বা ঢেকে ফেলা । রাতের আঁধারেই হিংস্র জন্তু, ক্ষতিকর পোকামাকড় ও অপরাধপ্রবণ মানুষ আপন উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে, তাই বিশেষভাবে এই সময়ের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে । কোনো কোনো মুফাসসির ‘গাসিক্ব’-কে অস্তগামী চাঁদ অর্থেও নিয়েছেন ।
আগের আয়াতের ব্যাপক অনিষ্টের মধ্যে এটি অন্তর্ভুক্ত হলেও আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে গুরুত্বের জন্য । ‘গাসিক্ব ইযা ওয়াক্বাব’ শব্দচিত্রে ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসা অন্ধকারের ছবি, যা ভয় ও অসহায়ত্বের অনুভূতি জাগায় ।
আগের আয়াতে চাওয়া হয়েছিল সব সৃষ্ট অনিষ্ট থেকে আশ্রয়; এই আয়াত সেই ব্যাপকতা থেকে নেমে আসে একটি নির্দিষ্ট, পরিচিত বিপদে, রাতের অন্ধকার । আর পরের আয়াতে আসবে আরেক নির্দিষ্ট অনিষ্ট, গ্রন্থিতে ফুঁ দেওয়া জাদু; অর্থাৎ সাধারণ থেকে বিশেষে নেমে আসার ধারাবাহিকতায় একে একে বড় বিপদগুলোর নাম নেওয়া হচ্ছে ।
দিনের আলোয় বিপদ চোখে পড়ে, সাবধান হওয়া যায়; কিন্তু রাত যখন গাঢ় হয়ে সব ঢেকে ফেলে, তখন অচেনা আশঙ্কারা জেগে ওঠে, হিংস্র প্রাণী, ক্ষতিকর কীট, আড়ালে ওঁত পেতে থাকা অপরাধী [১][২]। তাই সব অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার পর বান্দা বিশেষভাবে এই ছেয়ে-আসা অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চায়, যখন সে সবচেয়ে অসহায় বোধ করে [২][৩]। কেউ কেউ একে অস্তগামী চাঁদের অন্ধকার অর্থেও বুঝেছেন [৫]। ব্যাপক আশ্রয়ের পর এই নির্দিষ্ট আশ্রয় যেন বলে দেয়, আল্লাহ কেবল বড় বিপদ নয়, প্রতিদিনের চেনা ভয় থেকেও আশ্রয়দাতা।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
আয়াতটি একটি সহজ উদাহরণে বুঝিয়ে দিন।
কল্পনা করুন গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেছে, চারদিক নিকষ অন্ধকার; তখন ছোট্ট শব্দও বুকে কাঁপন ধরায়, কারণ বিপদ দেখা যায় না । আয়াতটি সেই অনুভূতিকেই ছুঁয়ে বলে, ছেয়ে-আসা অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও । রাতেই তো হিংস্র জন্তু ও আড়ালের অপরাধীরা বেরোয়; তাই এই সময়ের অসহায়ত্বে রবের আশ্রয়ই সবচেয়ে বড় ভরসা ।
‘গাসিক্ব’ ও ‘ওয়াক্বাব’ শব্দের অর্থ কী?
‘গাসিক্ব’ অর্থ অন্ধকার বা রাত্রি, আর ‘ওয়াক্বাব’ অর্থ সেই অন্ধকার পূর্ণরূপে বেড়ে যাওয়া বা চারদিক ঢেকে ফেলা । অর্থাৎ আয়াতের ছবি হলো, রাত যখন গাঢ় হয়ে সব আচ্ছন্ন করে ফেলে। কোনো কোনো মুফাসসির ‘গাসিক্ব’-কে অস্তগামী চাঁদ অর্থেও নিয়েছেন, কারণ চাঁদ ডুবে গেলে অন্ধকার নামে ।
বিশেষভাবে রাতের অন্ধকারের কথা কেন এলো?
কারণ রাতের আঁধারেই অনিষ্টের আশঙ্কা বেশি। হিংস্র প্রাণী, ক্ষতিকর পোকামাকড়, আর অপরাধপ্রবণ মানুষ রাতেই নিজেদের উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়, আর অন্ধকারে মানুষ সবচেয়ে অসহায় থাকে । তাই ব্যাপক অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার পরেও বিশেষভাবে এই সময়ের অনিষ্ট আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে, যেন এই পরিচিত ভয়টিকে অবহেলা না করা হয় ।
‘গাসিক্ব’-এর ‘অস্তগামী চাঁদ’ ব্যাখ্যাটি কীভাবে বুঝব?
কিছু মুফাসসির ‘গাসিক্ব’-কে রাত না বুঝে অস্তগামী চাঁদ অর্থে নিয়েছেন; কারণ চাঁদ যখন ডুবে যায়, তখনই গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে । ফলে অর্থ দাঁড়ায়, সেই অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়, যা চাঁদ ডুবে গেলে ছড়িয়ে পড়ে। উভয় ব্যাখ্যাই একই দিকে যায়, আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে অন্ধকার ও তাতে লুকিয়ে থাকা বিপদ থেকে ।
ব্যাপক অনিষ্টের পর নির্দিষ্ট অনিষ্ট আনার তাৎপর্য কী?
আগের আয়াতে সব সৃষ্ট অনিষ্ট ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবু রাতের অন্ধকারকে আলাদা করে আনা হয়েছে গুরুত্ব দিতে । এটি অলংকারের একটি পরিচিত রীতি, সাধারণের পর বিশেষকে উল্লেখ করা, যাতে প্রায়-ঘটে এমন বড় বিপদগুলো আলাদা মনোযোগ পায়। এরপরের আয়াতগুলোতেও একইভাবে জাদু ও হিংসার কথা আলাদা করে আসবে ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
এই আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে নাফফাছাত (النفّاثات)-এর অনিষ্ট থেকে-যারা গিরায় ফুঁক দেয়, অর্থাৎ জাদুকর নারী, কিংবা ব্যাপকভাবে জাদুকর আত্মা ও দলগুলো । নাফছ (نفث) শব্দের অর্থ থুথুর সঙ্গে হালকা ফুঁ দেওয়া, আর উকাদ (العقد) হলো উকদা (عقدة) তথা গিরার বহুবচন । জাদুকর সুতা বা দড়িতে গিরা বেঁধে তাতে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেয়-এ-ই তাদের ক্রিয়াপদ্ধতি, যাকে কুরআন এমন সূক্ষ্ম রূপকল্পে ধরেছে । স্ত্রীলিঙ্গ নাফফাছাত নিয়ে তাফসিরকারগণ ব্যাখ্যা দেন: কেউ বলেন এটি প্রকৃত নারীদের বিশেষণ, কেউ বলেন উহ্য আন-নুফূস (النفوس) তথা আত্মার বিশেষণ, ফলে নর-নারী উভয়েই এতে অন্তর্ভুক্ত হয় । ইবনে কাসীর এখানে নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত জাদুর সুপরিচিত ঘটনা বর্ণনা করেন-লুবাইদ ইবনে আসামের গেরো-বাঁধা জাদু, কূপ থেকে তা বের করা এবং এই দুই সূরা পাঠে আল্লাহর আরোগ্য । জাদুর নিজস্ব প্রভাব নিয়ে যামাখশারীর মুতাযিলি অবস্থান থাকলেও আহলে সুন্নাহ কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে এর বাস্তবতা ও প্রভাব স্বীকার করেন । এখানে শর্ত-ছাড়া নিঃশর্তভাবে অনিষ্টের কথা বলা হয়েছে-কেননা প্রতিটি জাদুকরই অনিষ্টকর ।
এ আয়াত-সম্পর্কিত যে পটভূমি সূত্রগুলো উল্লেখ করে তা হলো নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত জাদুর ঘটনা: এক ইহুদি-বর্ণনায় লুবাইদ ইবনে আসাম-নবী (সঃ)-এর চুল ও চিরুনির দাঁত হস্তগত করে গেরো-বাঁধা জাদু করে যারওয়ান কূপে রাখে; এতে নবী (সঃ) অসুস্থ হন, পরে জিবরাঈল (আঃ)-এর জানানো অনুযায়ী তা বের করা হয় এবং এই দুই সূরা পাঠে গেরোগুলো একে একে খুলে গিয়ে তিনি সুস্থ হন । নাজম আদ-দুরারও বলে যে এ আয়াত নাজিল হওয়ার কারণ ছিল এক ইহুদি কর্তৃক নবী (সঃ)-কে জাদু করা ও তাঁর অসুস্থ হওয়া ।
অলংকারের প্রথম দিক হলো নির্ধারিত-অনির্ধারিতের সূক্ষ্ম পার্থক্য: এখানে আন-নাফফাছাত (النفّاثات) মা'রিফা তথা নির্ধারিতরূপে এসেছে, কারণ প্রতিটি জাদুকরই অনিষ্টকর; অথচ আগের আয়াতে গাসিক (غاسق) ও পরের আয়াতে হাসিদ (حاسد) এসেছে নাকিরা তথা অনির্ধারিতরূপে, কেননা প্রত্যেক রাত বা প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতিকর নয় । দ্বিতীয়ত, নাফফাছাত-এ অতিশয়োক্তির সীগা (মুবালাগা) এবং বহুবচন-স্ত্রীলিঙ্গ একসঙ্গে ব্যবহৃত, যাতে কম মাত্রার জাদুও অগ্রাধিকারক্রমে এর অন্তর্ভুক্ত হয় । তৃতীয়ত, জাদুর সমগ্র জটিল কর্মকে কুরআন ধরেছে এক ক্ষুদ্র মূর্ত দৃশ্যে-গিরায় ফুঁক-যা ভয়াবহতাকে দৃশ্যমান করে তোলে ।
আগের আয়াতে রাত্রির অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছিল; নাজম আদ-দুরার দেখায় যে জাদু হলো সেই অন্ধকার-অনিষ্টের সবচেয়ে চরম ও গভীর রূপ-যা শিরা-উপশিরায় প্রবেশ করে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্রের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়, দেহকে শীর্ণ করে, এমনকি প্রাণ পর্যন্ত নেয়; তাই অন্ধকারের অনিষ্টের পরেই জাদুর অনিষ্টের উল্লেখ এসেছে । আর পরের আয়াতে হিংসুকের অনিষ্টের সঙ্গে এর যোগ এই যে-জাদু, রাত ও হিংসা তিনটিই গোপন, লুকানো অনিষ্ট, যা মানুষকে অজান্তে আঘাত করে; এ কারণেই সাধারণ "যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট" বলার পরও বিশেষভাবে এই গোপন অনিষ্টগুলোকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে । যামাখশারী মনে করিয়ে দেন, হিংসা থেকেই জাদুর জন্ম নেয়-ইহুদিরা হিংসাবশতই নবী (সঃ)-কে জাদু করেছিল ।
কল্পনা করুন গভীর রাতে কেউ গোপনে এক টুকরো সুতায় একের পর এক গিরা বাঁধছে, প্রতিটি গিরায় ফিসফিস মন্ত্র পড়ে থুথুর সঙ্গে হালকা ফুঁ দিচ্ছে-এই-ই নাফফাছাত (النفّاثات)-এর দৃশ্য, গিরায় ফুঁকদানকারী জাদুকরের অনিষ্ট, যা থেকে এ আয়াতে রবের কাছে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে [১][২][৫]। নাফছ মানে থুথুমিশ্রিত ফুঁ, আর উকাদ মানে গিরা; জাদুকর দড়িতে গেরো বেঁধে তাতে অভিশাপ ফুঁকে দেয় [১][৭]। শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গে এসেছে বলে কেউ একে নারীদের, কেউ আত্মার বিশেষণ বলেছেন-ফলে অর্থে নর-নারী উভয় জাদুকরই ঢুকে পড়ে [১][২][৭]। এর সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত সেই গেরো-বাঁধা জাদু, যা এই দুই সূরা পাঠেই একে একে খুলে গিয়েছিল [৪]। লক্ষ করুন বিন্যাসটি: আগের আয়াতে অন্ধকার রাতের অনিষ্ট, এ আয়াতে জাদু-অন্ধকার-অনিষ্টের চূড়ান্ত রূপ, যা সংসার ভাঙে ও দেহ-প্রাণ কাড়ে [৭]-আর এরপরই আসে হিংসুকের অনিষ্ট, কেননা হিংসা থেকেই জাদুর জন্ম [৪][৬]। তিনটিই গোপন আঘাত, অদৃশ্যে হানা দেয়; তাই সাধারণভাবে সব অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার পরও বিশেষভাবে এই লুকানো শত্রুদের নাম ধরে আশ্রয় চাওয়া হলো-যাতে বান্দা জানে, যে শত্রু চোখে দেখা যায় না, তার থেকেও রক্ষাকর্তা একমাত্র তার রব [৬]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
নাফফাছাত বা গিরায় ফুঁক দেওয়া বলতে আসলে কী বোঝায়?
কল্পনা করুন একজন জাদুকর একটি সুতা বা দড়ি নিয়ে তাতে কয়েকটি গিরা বা গেরো বাঁধছে, আর প্রতিটি গিরায় কিছু মন্ত্র পড়ে থুথুর সঙ্গে হালকা করে ফুঁ দিচ্ছে-এটাই নাফছ (نفث) তথা ফুঁ দেওয়া, আর উকাদ (العقد) হলো গিরা । জাদুকর যাকে ক্ষতি করতে চায় তার চুল বা ব্যবহৃত কোনো জিনিস জোগাড় করে তাতেই এই গেরো-বাঁধা জাদু করে । জালালাইন স্পষ্ট করেন, তারা সুতায় গিরা বাঁধে এবং থুথু ছাড়াই বা থুথুসহ কিছু মন্ত্র পড়ে তাতে ফুঁ দেয় । এই গোটা অপকর্মটিকেই কুরআন এক ক্ষুদ্র দৃশ্যে ধরেছে।
শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গে কেন-তবে কি কেবল নারীরাই জাদু করে?
না, কেবল নারীদেরই বোঝানো হয়নি। আন-নাফফাছাত (النفّاثات) স্ত্রীলিঙ্গ হওয়ায় তাফসিরকারগণ কয়েকটি ব্যাখ্যা দেন। প্রথম মত: এটি প্রকৃত নারীদের বিশেষণ, অর্থাৎ জাদুকর নারী । দ্বিতীয় মত: এটি উহ্য আন-নুফূস (النفوس) তথা আত্মার বিশেষণ-তাহলে অর্থ দাঁড়ায় গিরায় ফুঁকদানকারী মন্দ আত্মাদের অনিষ্ট । আবার এটি ফুঁকদানকারীদের একটি দল বা সমষ্টিকেও বোঝাতে পারে, যাতে নর-নারী উভয়ই অন্তর্ভুক্ত । মোটকথা উদ্দেশ্য হলো জাদুর মতো জঘন্য কর্মের কর্তা-সে নারী হোক বা পুরুষ-সকলের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া ।
জাদু কি সত্যিই প্রভাব ফেলে, নাকি তা নিছক ধাঁধা মাত্র?
এ বিষয়ে তাফসিরে দুটি ধারা দেখা যায়। যামাখশারী মুতাযিলি অবস্থান থেকে বলেন জাদুর নিজস্ব কোনো প্রকৃত প্রভাব নেই; তবে তিনিও স্বীকার করেন যে কখনো আল্লাহ পরীক্ষাস্বরূপ কিছু ঘটিয়ে দেন, যাতে দৃঢ়-বিশ্বাসী আর অজ্ঞ-গণ আলাদা হয়ে যায় । কিন্তু এই মতের বিপরীতে আহলে সুন্নাহ কিতাব ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে জাদুর বাস্তবতা ও প্রভাব-উভয়ই স্বীকার করেন, কেননা নবী (সঃ)-কে চিরুনি ও চুলে জাদু করা হয়েছিল এবং তা থেকে আশ্রয় চাওয়ারই নির্দেশ এসেছে । নাজম আদ-দুরারও বলেন, জাদু আল্লাহর অনুমতিক্রমে রোগ ঘটায়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে ।
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা আছে কি?
হ্যাঁ। ইবনে কাসীর ও নাজম আদ-দুরার উভয়েই নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত জাদুর সুপরিচিত ঘটনা উল্লেখ করেন । এক ইহুদি-বর্ণনায় লুবাইদ ইবনে আসাম-নবী (সঃ)-এর কয়েকটি চুল ও তাঁর চিরুনির দাঁত হস্তগত করে তাতে গেরো-বাঁধা জাদু করে এবং তা যারওয়ান কূপে রাখে; এতে নবী (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন । পরে জিবরাঈল (আঃ) তা জানালে নবী (সঃ) লোক পাঠিয়ে কূপ থেকে জাদুর গেরোগুলো বের করান; বর্ণনায় এতে বারোটি গিরা ছিল, প্রতিটিতে একটি সূচ বিদ্ধ । এরপর এই দুই সূরা নাজিল হয়, এবং প্রতিটি আয়াত পাঠে একটি করে গিরা খুলে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হন ।
নবী (সঃ) জাদুকারীর ওপর কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন?
সুস্থ হওয়ার পর সাহাবিগণ সেই জাদুকারীকে শাস্তি দেওয়ার কথা বললে নবী (সঃ) তা করেননি । সহিহ বুখারির বর্ণনায় তিনি বলেন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, তিনি আমাকে আরোগ্য দিয়েছেন; আমি মানুষের মধ্যে মন্দ বা ফাসাদ ছড়ানো পছন্দ করি না । জাদুকৃত হওয়া সত্ত্বেও তিনি জাদুকারীকে একটি কটু কথাও বলেননি, ধমকও দেননি, এমনকি তাকে দেখে মুখও মলিন করেননি । এতে যেমন তাঁর অসাধারণ ক্ষমাশীলতা ফুটে ওঠে, তেমনি বোঝা যায় প্রকৃত নিরাময় ও রক্ষা একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসে-আর সেই রক্ষার বাহন ছিল এই কুরআনি আশ্রয়-প্রার্থনা ।
সাধারণভাবে সব অনিষ্টের কথা বলার পরও আলাদা করে জাদুকরের অনিষ্টের উল্লেখ কেন?
কারণ এই অনিষ্ট গোপন ও লুকানো। যামাখশারী প্রশ্ন তুলে নিজেই উত্তর দেন: 'যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে'-এ তো সব অনিষ্টকেই ঢেকে নেয়; তবু রাত, জাদুকর ও হিংসুকের কথা আলাদা করে বলা হলো কেন? কারণ এদের অনিষ্ট গোপন, মানুষকে অজান্তেই আঘাত করে, যেন গোপনে আক্রমণ করে । তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সেই, যে এমনভাবে ফন্দি আঁটে যা তুমি টেরও পাও না । লক্ষণীয়, এখানে নাফফাছাত নির্ধারিতরূপে এসেছে কারণ প্রতিটি জাদুকরই অনিষ্টকর, অথচ গাসিক ও হাসিদ অনির্ধারিত, কারণ প্রত্যেক রাত বা প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতিকর নয় ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
এই আয়াতে ফালাকের রবের কাছে আশ্রয় প্রার্থনার শেষ ও সবচেয়ে গূঢ় অনিষ্টটি উল্লেখ করা হয়েছে-হিংসুকের (حاسد) হিংসা, যখন সে হিংসা করে। হাসাদ (حسد)-এর অর্থ, আল্লাহ কোনো বান্দাকে যে নেয়ামত, শ্রেষ্ঠত্ব বা গুণ দান করেছেন তা দেখে ভেতরে দগ্ধ হওয়া এবং সেই নেয়ামতের অবসান কামনা করা । মোফাসসিরগণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করিয়েছেন-আয়াতে শব্দটি নকিরাহ (অনির্দিষ্ট) রাখা হয়েছে, কারণ প্রত্যেক হিংসুক নিন্দনীয় নয়; কল্যাণের ক্ষেত্রে গিবতাহ বা প্রশংসিত আকাঙ্ক্ষা আছে, যা হাসাদ নয় । আবার বলা হয়েছে ‘যখন সে হিংসা করে’-অর্থাৎ যতক্ষণ হিংসা মনের ভেতরেই থাকে, ততক্ষণ কেবল হিংসুকই নিজে দগ্ধ হয়, অন্যের কোনো ক্ষতি হয় না; অনিষ্ট ঘটে তখনই যখন সে তা প্রকাশ করে এবং কথায়-কাজে, বদনজরে বা অন্য কৌশলে তার দাবি অনুসারে কাজ করে । মোফাসসিরগণ স্মরণ করিয়েছেন-এই হিংসাই ছিল আকাশে প্রথম গুনাহ (ইবলীসের আদমের প্রতি) ও পৃথিবীতে প্রথম গুনাহ (আদমপুত্রের) , এবং এই হিংসা থেকেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর জাদু করা হয়েছিল । তাই দুটি মুআওয়িযাতাইনের শেষে এই নিগূঢ়, গোপন, অদৃশ্যভাবে আঘাতকারী অনিষ্টটির বিরুদ্ধেই রবের আশ্রয় চাওয়া হয়েছে ।
মোফাসসিরগণ মুআওয়িযাতাইন (ফালাক ও নাস) নাযিলের একটি প্রসিদ্ধ কারণ বর্ণনা করেছেন: ইহুদিদের প্ররোচনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেবারত এক বালক তাঁর চিরুনির কয়েক গোছা চুল ও কয়েকটি দাঁত সংগ্রহ করে দেয়, এবং লাবীদ ইবনুল আ‘সাম নামক ইহুদি তাতে জাদু করে যারওয়ান কূপে গ্রন্থিবদ্ধ করে রাখে; নবী অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে অবহিত করলে আলী, যুবায়ের ও আম্মার (রাঃ) কূপ থেকে এগারোটি গ্রন্থিযুক্ত একটি সুতা বের করে আনেন; এই দুই সুরা নাযিল হলে প্রতিটি আয়াত পাঠে একটি করে গ্রন্থি খুলে যায় ও তিনি সুস্থ হন । আর এই গোটা ষড়যন্ত্রের মূল কারণ ছিল হিংসা-তাই সুরার শেষে স্পষ্টভাবে হিংসুকের অনিষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে ।
আয়াতের ভাষায় কয়েকটি সূক্ষ্ম অলংকার মোফাসসিরগণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, حاسد শব্দটি নকিরাহ তথা অনির্দিষ্ট রাখা-কারণ প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতিকর নয় ও সব হিংসা নিন্দনীয় নয়; পক্ষান্তরে আগের আয়াতে النَّفّاثات নির্দিষ্ট করা হয়েছে, কারণ প্রত্যেক ফুঁৎকারিনীই অনিষ্টকারিণী । দ্বিতীয়ত, ইসম ফায়িল ‘حاسد’ ব্যবহার করে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যার চরিত্রে হিংসা স্থায়ীভাবে প্রোথিত । তৃতীয়ত, ‘إذا حَسَدَ’ শর্তের সংযোজন এক চমৎকার কয়দ বা সীমাবদ্ধকরণ: হিংসা প্রকাশ পেলে তবেই অনিষ্ট, গোপন থাকলে কেবল হিংসুকই পীড়িত । যামাখশারী উমর ইবন আবদুল আযীযের বাণী উদ্ধৃত করেছেন: ‘হিংসুকের চেয়ে মজলুমের অধিক সদৃশ কোনো জালিম আমি দেখিনি’ । চতুর্থত, সাধারণ ‘مِن شَرِّ ما خَلَقَ’-এর পরেও তিনটি অনিষ্ট বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ এগুলো গোপনে, অজান্তে আঘাত করে-যেন গুপ্তঘাতকের মতো .
আগের আয়াতে গ্রন্থিতে ফুঁৎকারদানকারিণী জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে; এই আয়াত তার মূল চালিকাশক্তিকে উন্মোচন করে-কারণ জাদু ও মানুষের প্রতি অধিকাংশ অনিষ্টের সবচেয়ে বড় প্রেরণাই হলো হিংসা । আল-বিকাঈ এই সংযোগকে স্পষ্ট করেছেন: ‘যেহেতু জাদু ও অন্যান্য পীড়নের সবচেয়ে বড় বাহক হিংসা’, তাই আগের আয়াতের পরে স্বাভাবিকভাবেই হিংসুকের কথা এসেছে । তিনি আরও দেখিয়েছেন যে এটিই সুরার শেষ আয়াত, এবং এর মাধ্যমে ‘সুরার শেষ তার শুরুর দিকে ফিরে যায়’-কেননা সূচনায় ছিল সাধারণ ‘সৃষ্টির অনিষ্ট’ আর শেষে এসে সবচেয়ে গূঢ় ও সর্বনাশা অনিষ্ট হিংসায় তা পরিণতি পেয়েছে । যেহেতু এটি সুরার সর্বশেষ আয়াত, এর পরে আর কোনো আয়াত নেই; বরং এর ক্রমধারা গিয়ে মিশেছে পরবর্তী সুরা নাস-এর সঙ্গে, যা আশ্রয়প্রার্থনার পূর্ণতা-দুই মুআওয়িযাতাইন একত্রে এগারোটি আয়াত, ফালাক পাঁচ ও নাস ছয় ।
সুরা ফালাকে আশ্রয়ের পরিধি ক্রমে সংকীর্ণ ও গভীর হয়ে এসেছে-প্রথমে সমস্ত সৃষ্টির অনিষ্ট, তারপর আঁধার রাত, তারপর গ্রন্থিতে ফুঁ দেওয়া জাদুকারিনীরা, আর সবশেষে এসে থামল সেই উৎসে, যেখান থেকে এসব অনিষ্ট জন্ম নেয়: হিংসুকের হিংসা। হাসাদ মানে অন্যের ভালো দেখে ভেতরে জ্বলে ওঠা ও সেই ভালোটুকু মুছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা [১][২]। কুরআন এখানে দুটি সূক্ষ্ম শর্ত রেখেছে। এক, সব হিংসা সমান নয়-তাই ‘হিংসুক’ শব্দটি অনির্দিষ্ট, কারণ কল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাময় আকাঙ্ক্ষা নিন্দনীয় হিংসা নয় [১][৬][৭]। দুই, ‘যখন সে হিংসা করে’-অর্থাৎ যতক্ষণ হিংসা বুকের ভেতরে চাপা থাকে, ততক্ষণ সে কেবল নিজেকেই পোড়ায়, অন্যের সুখে নিজেই অসুখী হয়; ক্ষতি শুরু হয় তখনই, যখন সে তা প্রকাশ করে, বদনজরে কিংবা চক্রান্তে তার দাবি অনুযায়ী কাজ করে [৬][৭]। এই হিংসাই ছিল ইতিহাসের প্রথম পাপ-আকাশে ইবলীসের, পৃথিবীতে আদমপুত্রের [১]; আর এই হিংসা থেকেই নবীজির ওপর সেই জাদু করা হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে আগের আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হলো [৪][৭]। তাই হিংসুকের কথা আলাদা করে শেষে আনা-কাকতালীয় নয়; কারণ জাদুসহ মানুষের প্রতি অধিকাংশ পীড়নের শিকড়ই হিংসা [৭]। অন্য অনিষ্ট চোখে পড়ে, ঠেকানো যায়; কিন্তু হিংসা গুপ্ত, নিঃশব্দে, অজান্তে আঘাত হানে-তাই এর বিরুদ্ধে রক্ষা চাইতে হয় কেবল ফালাকের রবের কাছেই [৬].
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
সহজ করে বললে-এই আয়াত আসলে কোন বিপদের কথা বলছে?
ধরুন, পাশের বাড়ির কেউ একটা সুন্দর জিনিস পেল-ভালো ফসল, সুস্থ সন্তান, সম্মান। আরেকজন তা দেখে খুশি না হয়ে ভেতরে জ্বলতে থাকল, মনে মনে চাইল জিনিসটা নষ্ট হয়ে যাক। এটাই হাসাদ (حسد): অন্যের নেয়ামত দেখে দগ্ধ হওয়া ও তার ধ্বংস কামনা করা । আয়াত বলছে, এই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে রবের আশ্রয় চাও-বিশেষত ‘যখন সে হিংসা করে’, অর্থাৎ মনের আগুন নেভাতে কথায়-কাজে বা বদনজরে কিছু করে বসে । চোখে দেখা যায় না বলেই এই বিপদ আরও ভয়ংকর; তাই আলাদা করে এর উল্লেখ ।
সব হিংসাই কি নিন্দনীয়? শব্দটা অনির্দিষ্ট রাখা হলো কেন?
না, সব হিংসা নিন্দনীয় নয়-আর এ কারণেই আয়াতে حاسد শব্দটি নকিরাহ বা অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে । যামাখশারী বলেন, প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতি করে না; কল্যাণের ক্ষেত্রে এক প্রশংসিত আকাঙ্ক্ষা আছে, যাকে গিবতাহ বলা যায়-অন্যের মতো ভালো পাওয়ার চাওয়া, অন্যেরটা নষ্ট হওয়ার চাওয়া নয় । আবু বকর যাকারিয়াও স্পষ্ট করেছেন, কেউ যদি চায় তাকেও তেমন অনুগ্রহ দেওয়া হোক, তবে তা হাসাদের সংজ্ঞায় পড়ে না । তাই অনির্দিষ্ট শব্দটি ইঙ্গিত করে-আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে কেবল সেই নিন্দিত হিংসা থেকে, যা অন্যের নেয়ামতের অবসান চায় ।
‘যখন সে হিংসা করে’-এই শর্তটুকু কেন জরুরি ছিল?
এই শর্তেই আয়াতের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা লুকিয়ে। মোফাসসিরগণ বলেন, যতক্ষণ হিংসা মনের ভেতরে চাপা থাকে, ততক্ষণ তা দিয়ে কেবল হিংসুক নিজেই কষ্ট পায়-অন্যের সুখে সে নিজেই অসুখী হয়, ক্ষতি হয় তার নিজেরই । অন্যের ক্ষতি শুরু হয় তখনই, যখন সে হিংসা প্রকাশ করে এবং তার দাবি অনুযায়ী কাজে নামে-বদনজর, ষড়যন্ত্র বা জাদুর মতো । তাই ‘إذا حَسَدَ’ যোগ করে অনিষ্টকে সেই মুহূর্তে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে যখন তা কার্যে রূপ নেয় । যামাখশারী উমর ইবন আবদুল আযীযের কথা উদ্ধৃত করেছেন: ‘হিংসুকের চেয়ে মজলুমসদৃশ জালিম আমি দেখিনি’-কারণ সে নিজের আগুনে নিজেই পোড়ে ।
এই হিংসার কথা সুরার একেবারে শেষে কেন আনা হলো?
কারণ হিংসাই সব অনিষ্টের শিকড়। আল-বিকাঈ দেখান, জাদুসহ মানুষের প্রতি অধিকাংশ পীড়নের সবচেয়ে বড় প্রেরণাই হলো হাসাদ, তাই আগের আয়াতের জাদুকারিনীদের পর স্বাভাবিকভাবেই হিংসুকের কথা এসেছে । এর মাধ্যমে সুরার শেষ তার শুরুর দিকে ফিরে গেছে: সূচনায় ছিল সাধারণ ‘সৃষ্টির অনিষ্ট’, আর শেষে এসে তা পরিণতি পেয়েছে সবচেয়ে গূঢ় ও সর্বনাশা অনিষ্টে । মোফাসসিরগণ আরও স্মরণ করান, এই হিংসাই আকাশে প্রথম গুনাহ (ইবলীস) ও পৃথিবীতে প্রথম গুনাহ (আদমপুত্র) , এবং এই হিংসা থেকেই নবীজির ওপর জাদু হয়েছিল -তাই শেষে এর উল্লেখ একান্ত যথাযথ।
সাধারণভাবে ‘সৃষ্টির অনিষ্ট’ বলার পরও আবার আলাদা করে রাত, জাদু ও হিংসার কথা কেন?
এটি এক অলংকারিক প্রশ্ন, যা যামাখশারী নিজেই তুলে নিজেই জবাব দিয়েছেন। প্রথম আয়াতের ‘مِن شَرِّ ما خَلَقَ’ আসলে সব অনিষ্টকেই ঢেকে ফেলে । তবু এই তিনটি-আঁধার রাত, ফুঁৎকারিনী জাদুকারিনী ও হিংসুক-বিশেষভাবে উল্লিখিত, কারণ এদের অনিষ্ট গোপন ও লুকানো; মানুষ জানতেও পারে না কোথা থেকে আঘাত এল, যেন গুপ্তঘাতক অসতর্ক মুহূর্তে আঘাত হানল । আরবরা বলত: সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সেই, যে এমন দিক থেকে ছল করে যা তুমি টেরও পাও না । তাই সাধারণের ভেতর থেকে এই বিশেষ অদৃশ্য বিপদগুলোকে আলাদা করে আশ্রয়ের আবেদনে আনা হয়েছে।
এই আয়াত কি বলছে যে জাদু ও বদনজর সত্যিই কার্যকর?
মোফাসসিরদের মাঝে এ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আহলে সুন্নাহর অভিমত-কিতাব ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল অনুযায়ী জাদু বাস্তব এবং তার প্রভাব আছে; নবীজির ওপর জাদুর ঘটনাই তার প্রমাণ । ইবন কাসীর বুখারি-মুসলিমের বরাতে সবিস্তারে সেই ঘটনা এনেছেন-কীভাবে গ্রন্থিতে জাদু করা হয় ও দুই সুরা পাঠে তা খুলে যায় । অন্যদিকে যামাখশারী মুতাযিলি মতে ঝুঁকে জাদুর প্রকৃত প্রভাব অস্বীকারের প্রবণতা দেখান, যা টীকাকার ইবন মুনীর সংশোধন করে আহলে সুন্নাহর অবস্থান তুলে ধরেন । মূল কথা-আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না; তাই রক্ষা একমাত্র ফালাকের রবের কাছেই ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
আন-নাসالناس
▶তাফসীর সামারি
সূরা আন-নাসের সূচনা আশ্রয়-প্রার্থনা দিয়ে, ‘ক্বুল আউযু বিরব্বিন নাস’, বলুন, আমি মানুষের রবের আশ্রয় চাই । এই সূরায় আল্লাহর তিনটি গুণ পরপর এসেছে, রব (প্রতিপালক), মালিক (অধিপতি) ও ইলাহ (মাবুদ) । ‘রব’ সেই সত্তা যিনি মাতৃগর্ভ থেকেই মানুষের লালন-পালন করেন, ধীরে ধীরে তাকে পূর্ণতায় পৌঁছে দেন; এই প্রতিপালন কেবল কিছু মানুষের নয়, সমগ্র মানবজাতির, বরং সমস্ত সৃষ্টিরই । এখানে বিশেষভাবে ‘মানুষ’ উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মর্যাদা বোঝাতে, আর যেহেতু আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে সেই কুমন্ত্রণাদাতা থেকে যে মানুষের অন্তরেই ফিসফিস করে ।
তিন আয়াতে ‘নাস’ (মানুষ) শব্দটি বারবার এসেছে, রব্বিন নাস, মালিকিন নাস, ইলাহিন নাস; এই পুনরাবৃত্তি একদিকে জোর দেয়, অন্যদিকে মানুষের প্রতি বিশেষ মমত্ব ও মনোযোগ ফুটিয়ে তোলে । সমস্ত সৃষ্টির রব হয়েও বিশেষভাবে ‘মানুষের রব’ বলা হয়েছে তাদের সম্মান দিতে এবং অন্তরের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয়ের প্রসঙ্গের সঙ্গে মিল রেখে ।
এটি সূরার প্রথম আয়াত, তাই পূর্বে কিছু নেই; তবে এটি পরের দুই আয়াতের ভিত্তি গড়ে দেয়, ‘মালিকিন নাস’ ও ‘ইলাহিন নাস’ । আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এমন এক সত্তার কাছে যিনি একইসঙ্গে মানুষের প্রতিপালক, অধিপতি ও মাবুদ; রব থেকে মালিক, মালিক থেকে ইলাহ, এই ক্রমে যেন আশ্রয়দাতার পরিচয় ধাপে ধাপে পূর্ণতা পায় ।
বিপদ যখন বাইরের, আমরা শক্তিশালী কারও আশ্রয় খুঁজি; কিন্তু এই সূরার বিপদ ভেতরের, অন্তরে ফিসফিস করা কুমন্ত্রণা। তাই আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এমন এক সত্তার কাছে, যিনি মানুষকে সবচেয়ে ভালো চেনেন, কারণ তিনিই মাতৃগর্ভ থেকে তাকে গড়েছেন ও লালন করেছেন, ‘মানুষের রব’ [২][৪]। এখানে ‘মানুষ’ শব্দ বারবার আসায় ফুটে ওঠে এক বিশেষ মমতা, যেন রব তাঁর প্রিয় সৃষ্টিকেই অন্তরের শত্রু থেকে আগলে রাখছেন [২][৫]। আর এই ‘রব’ পরিচয়ই পরের ‘মালিক’ ও ‘ইলাহ’-এর দিকে এগিয়ে নেয়, যেন বলা হচ্ছে, যিনি তোমাকে গড়েছেন, তিনিই তোমার মালিক, তিনিই তোমার একমাত্র মাবুদ, তাঁর কাছেই আশ্রয় নাও।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
আয়াতটি একটি সহজ উদাহরণে বুঝিয়ে দিন।
একটি শিশু ভয় পেলে ছুটে যায় মায়ের কোলে, কারণ মা-ই তাকে সবচেয়ে ভালো বোঝেন ও আগলে রাখেন। অন্তরের কুমন্ত্রণার ভয়ে বান্দাও তেমনি ছুটে যায় ‘মানুষের রবের’ কাছে, যিনি গর্ভ থেকেই তাকে গড়েছেন ও লালন করেছেন । যিনি তৈরি করেছেন, তিনিই তো সবচেয়ে ভালো জানেন কোথায় দুর্বলতা, কীভাবে রক্ষা করতে হয়; তাই অন্তরের অদৃশ্য শত্রু থেকে তাঁর আশ্রয়ই সবচেয়ে নিরাপদ ।
‘রব’ শব্দের অর্থ এখানে কী?
‘রব’ সেই সত্তা যিনি শুরু থেকে, মানুষ যখন মাতৃগর্ভে, তখন থেকেই তার দেখভাল ও লালন-পালন করেন, যতক্ষণ না সে সাবালক ও জ্ঞানসম্পন্ন হয় । এই প্রতিপালন কেবল কিছু মানুষের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির, বরং সমস্ত সৃষ্টির জন্য ব্যাপক । জালালাইনে এসেছে, তিনি মানুষের স্রষ্টা ও মালিক । অর্থাৎ আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এমন একজনের কাছে, যাঁর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর ও আদি।
সব সৃষ্টির রব হয়েও বিশেষভাবে ‘মানুষের রব’ বলা হলো কেন?
যদিও আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টির রব, এখানে বিশেষভাবে ‘মানুষের রব’ বলা হয়েছে মানুষের মান ও মর্যাদা বোঝাতে । আরও একটি কারণ, এই সূরায় আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে সেই কুমন্ত্রণাদাতা থেকে যে মানুষেরই অন্তরে ফিসফিস করে; তাই যাদের রক্ষা করা উদ্দেশ্য, তাদের রবের পরিচয় দিয়েই শুরু করা হয়েছে, যা প্রসঙ্গের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায় ।
এই সূরায় আল্লাহর কোন তিনটি গুণ এসেছে?
পরপর তিন আয়াতে আল্লাহর তিনটি গুণ এসেছে, ‘রব’ (প্রতিপালক), ‘মালিক’ (অধিপতি) ও ‘ইলাহ’ (মাবুদ) । ইবনে কাসীর বলেন, সবকিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তাঁর মালিকানাধীন, আর সবাই তাঁরই আনুগত্য করে । এই তিন গুণ মিলিয়ে বোঝানো হয়, যাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে তিনি একইসঙ্গে স্রষ্টা, সর্বময় কর্তা ও একমাত্র উপাস্য, তাই তিনিই প্রকৃত আশ্রয়দাতা।
অন্তরের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে কেন ‘রবের’ কাছে আশ্রয়?
কারণ ভেতরের শত্রু বাইরের শত্রুর চেয়ে কঠিন; তাকে দেখা যায় না, ধরা যায় না। এমন গোপন বিপদ থেকে সেই-ই রক্ষা করতে পারেন, যিনি অন্তরের গভীর পর্যন্ত জানেন, আর সেই জানা সবচেয়ে বেশি মানুষের স্রষ্টা ও প্রতিপালকেরই । তাই ‘রব্বিন নাস’ দিয়ে শুরু করে বোঝানো হয়, যিনি তোমাকে গড়েছেন ও লালন করেছেন, অন্তরের ফিসফিস থেকেও তিনিই তোমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
আশ্রয়দাতার দ্বিতীয় পরিচয়, ‘মালিকিন নাস’, মানুষের অধিপতি বা প্রকৃত বাদশাহ । যিনি সমগ্র মানুষের প্রতিপালন করেন, তিনিই তাদের সবকিছুর মালিক, অধিপতি ও রাজা হওয়ার একমাত্র উপযুক্ত । মুখতাসারে এসেছে, তিনিই মানুষের অধিপতি, যিনি তাদের ব্যাপারে যথেচ্ছ ফায়সালা করেন; তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো প্রকৃত অধিপতি নেই । ইবনে কাসীর বলেন, সবকিছু তাঁর মালিকানাধীন এবং সবাই তাঁরই আনুগত্যে আবদ্ধ ।
এখানেও ‘নাস’ (মানুষ) শব্দটি আবার এসেছে, যা আগের আয়াতের সঙ্গে এক ছন্দময় পুনরাবৃত্তি তৈরি করে এবং জোর ও মমত্ব দুটোই বাড়ায় । আর ‘রব’ থেকে ‘মালিক’-এ উত্তরণে অর্থে এক আরোহণ ঘটে, লালনকর্তা থেকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী ।
আগের আয়াতে ছিল ‘রব্বিন নাস’ (মানুষের প্রতিপালক), এ আয়াতে ‘মালিকিন নাস’ (মানুষের অধিপতি); প্রতিপালনের পর আসে সর্বময় কর্তৃত্বের ঘোষণা । আর পরের আয়াতে আসবে ‘ইলাহিন নাস’ (মানুষের মাবুদ); রব থেকে মালিক, মালিক থেকে ইলাহ, এই ধাপে ধাপে আশ্রয়দাতার পরিচয় তার চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে যায়, যিনি একমাত্র উপাসনা ও আশ্রয়ের যোগ্য ।
যিনি গর্ভ থেকে তোমাকে গড়ে তুলেছেন (রব), তিনিই আবার তোমার সবকিছুর প্রকৃত মালিক ও অধিপতি (মালিক), যাঁর সিদ্ধান্তের ওপর কারও হাত নেই [২][৩]। দুনিয়ার রাজা-বাদশাহরা ক্ষণিকের কর্তৃত্ব পায়, কিন্তু মানুষের প্রকৃত অধিপতি একমাত্র তিনিই, তিনি ছাড়া কেউ তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না [৩]। প্রতিপালনের কোমলতার পর এই কর্তৃত্বের ঘোষণা যেন বলে, যাঁর কাছে আশ্রয় নিচ্ছ, তিনি কেবল স্নেহশীল লালনকর্তা নন, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীও; আর পরের আয়াতে তিনিই হবেন ‘ইলাহ’, একমাত্র মাবুদ, যেখানে আশ্রয়দাতার পরিচয় পূর্ণতা পায়।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
আয়াতটি একটি সহজ উদাহরণে বুঝিয়ে দিন।
কোনো রাজ্যে বিপদে পড়লে মানুষ রাজার কাছে বিচার চায়, কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁরই হাতে। আয়াতটি বলে, মানুষের প্রকৃত বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ, যাঁর ফায়সালার ওপর কারও খবরদারি নেই । দুনিয়ার ক্ষমতাবানরা আসে-যায়, কিন্তু সব মানুষের ভাগ্যের আসল নিয়ন্ত্রক তিনিই; তাই অন্তরের শত্রু থেকেও আশ্রয় তাঁরই কাছে, কারণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ তাঁরই হাতে ।
‘রব’ ও ‘মালিক’, দুই গুণের পার্থক্য কী?
‘রব’ লালন-পালন ও ধীরে ধীরে পূর্ণতায় পৌঁছানোর কোমল অর্থ বহন করে, আর ‘মালিক’ বোঝায় সর্বময় কর্তৃত্ব ও মালিকানা, যিনি যথেচ্ছ ফায়সালার অধিকারী । একটিতে আছে স্নেহ, অন্যটিতে কর্তৃত্ব; দুটি মিলে আশ্রয়দাতার পূর্ণ ছবি ফুটে ওঠে । যিনি ভালোবেসে গড়েছেন, ক্ষমতাও সম্পূর্ণ তাঁরই, তাই আশ্রয়ের জন্য তিনিই যথার্থ।
দুনিয়ায়ও তো অনেক ‘মালিক’ বা শাসক থাকে, এখানে কী আলাদা?
দুনিয়ার শাসকেরা ক্ষণস্থায়ী ও সীমিত কর্তৃত্ব পায়, যা একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের প্রকৃত অধিপতি একমাত্র আল্লাহ; তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো আসল মালিক নেই, আর তাঁর ফায়সালার ওপর কারও হস্তক্ষেপ চলে না । সবকিছু তাঁর মালিকানাধীন এবং সবাই তাঁরই আনুগত্যে আবদ্ধ । তাই প্রকৃত নিরাপত্তা কেবল এই চিরন্তন অধিপতির কাছেই।
‘রব’ থেকে ‘মালিক’-এ ক্রমটি কী শেখায়?
এই ক্রম এক আরোহণ, লালনকর্তা থেকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী, আর পরের আয়াতে মাবুদ পর্যন্ত । প্রথমে রব বলে অন্তরে জাগে নির্ভরতা ও ভালোবাসা, এরপর মালিক বলে জাগে সম্মান ও কর্তৃত্বের স্বীকৃতি, আর শেষে ইলাহ বলে আসে একনিষ্ঠ উপাসনা । ধাপে ধাপে এই পরিচয় বুঝিয়ে দেয়, আশ্রয় ও ইবাদত উভয়ের যোগ্য একমাত্র তিনিই।
‘মানুষ’ শব্দটি বারবার আসার তাৎপর্য কী?
রব্বিন নাস, মালিকিন নাস, ইলাহিন নাস, পরপর তিনবার ‘নাস’ শব্দের পুনরাবৃত্তি একদিকে অর্থে জোর দেয়, অন্যদিকে মানুষের প্রতি বিশেষ মমত্ব ও মনোযোগ ফুটিয়ে তোলে । যেহেতু আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়া শত্রু থেকে, বারবার ‘মানুষ’ বলে যেন আশ্বস্ত করা হয়, এই মানুষেরই রব, মালিক ও মাবুদ তাকে আগলে রাখছেন ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
এই আয়াতে আশ্রয় চাওয়ার তৃতীয় বিশেষণ এসেছে-‘ইলাহিন নাস’ (اله الناس), অর্থাৎ মানুষের একমাত্র মা’বুদ বা উপাস্য । সংক্ষিপ্ত তাফসীর স্পষ্ট করে দেয়, তিনিই মানুষের প্রকৃত মা’বুদ, তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো সত্য মা’বুদ নেই । ইবন কাসীর দেখান, এই ছোট্ট সূরায় আল্লাহর তিনটি গুণ পরপর সাজানো হয়েছে-রব বা পালনকর্তা, মালিক বা অধিপতি, এবং ইলাহ বা মা’বুদ। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তাঁর মালিকানাধীন, আর সবাই তাঁরই আনুগত্যাধীন । আবু বকর যাকারিয়াও এই তিন গুণকে এক সঙ্গে গেঁথে বলেন-আল্লাহ্ একাধারে রব, মালিক ও মা’বুদ; সব কিছুই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর মালিকানাধীন, তাঁর বান্দা, তাই এই তিন গুণে গুণান্বিত মহান সত্তার কাছেই আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । আহসানুল বায়ান এ একটি সূক্ষ্ম ক্রম দেখান-যিনি সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা এবং যাঁর হাতে গোটা দুনিয়ার বাদশাহী, একমাত্র তিনিই সর্বপ্রকার ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, একক মা’বুদ । যামাখশারী ও বিকাঈ যোগ করেন, ‘ইলাহ’ শব্দটি একান্তভাবে আল্লাহরই, এতে কারও অংশীদারিত্ব নেই; তাই বর্ণনার চূড়ান্ত স্তর হিসেবে একে শেষে রাখা হয়েছে ।
এ আয়াতের ভাষাশৈলী কয়েকটি দিক থেকে অসাধারণ। প্রথমত, ‘রব’, ‘মালিক’ ও ‘ইলাহ’-এই তিনটি বিশেষণ বদল, সিফাত বা ‘আতফে বায়ান হিসেবে পরপর সাজানো, যেখানে ‘ইলাহ’ সর্বশেষে এসে বর্ণনার চূড়ান্ত পরিণতি (গায়াতুল বায়ান) হয়েছে । দ্বিতীয়ত, প্রতিবার ‘নাস’ (الناس) শব্দটি গোপন সর্বনামে না ফিরে প্রকাশ্যভাবে পুনরাবৃত্ত হয়েছে-‘ইলাহুহুম’ না বলে ‘ইলাহিন নাস’ বলা হয়েছে; কারণ ‘আতফে বায়ান বর্ণনার স্পষ্টতার জন্যই, তাই এখানে ইযমার নয় ইযহারই উপযুক্ত । বিকাঈ দেখান, এই পুনরাবৃত্তি মানুষের তীব্র মুখাপেক্ষিতা ফুটিয়ে তোলে এবং বোঝায় প্রতিটি দিক থেকেই আল্লাহ্ তাদের পরিচালক । তৃতীয়ত, ‘ওয়াও’ দিয়ে যুক্ত না করে বিশেষণগুলো পাশাপাশি বসানো হয়েছে, যাতে মনে না হয় এরা ভিন্ন ভিন্ন সত্তা-আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এক সত্তার সমষ্টিগত গুণাবলির কাছে ।
এই তিনটি আয়াত একটি আরোহী সিঁড়ির মতো-‘রবিন নাস’ (পালনকর্তা), তারপর ‘মালিকিন নাস’ (অধিপতি), শেষে ‘ইলাহিন নাস’ (মা’বুদ) । বিকাঈ এই ক্রমের রহস্য খুলে বলেন: রুবুবিয়্যাত আগে এসেছে তার ব্যাপকতার জন্য, কারণ প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুই সমানভাবে প্রতিপালিত; মাঝে এসেছে মালিকিয়্যাত, কারণ মালিকই আদেশ-নিষেধের অধিকারী এবং তাঁর মালিকানা তাঁর সৃষ্টিরই অনুসরণ; আর ইলাহিয়্যাত শেষে এসেছে তার বিশেষত্বের জন্য । তিনি দেখান, রুবুবিয়্যাত মালিকিয়্যাতকে অপরিহার্য করে, আর মালিকিয়্যাত ইলাহিয়্যাতকে-এক গুণ থেকে আরেক গুণ অনিবার্যভাবে বেরিয়ে আসে । যিনি পালক ও অধিপতি, তিনি ছাড়া আর কারও মা’বুদ হওয়ার অধিকার নেই, কারও কাছে আশ্রয় চাওয়াও সাজে না । আর এই তিন গুণের সমন্বয়েই পরের আয়াতে আসা শত্রু-কুমন্ত্রণাদাতা, আত্মগোপনকারী ওয়াসওয়াসা-র অনিষ্ট থেকে পূর্ণ আশ্রয় নিশ্চিত হয় ।
duplicate
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
‘মানুষের ইলাহ’ কথাটা সহজভাবে বুঝতে চাই-একটা উদাহরণ দিয়ে বলবেন?
ভাবুন, কেউ ভয়ংকর বিপদে পড়ে প্রথমে ছুটে যায় তার পালক বা অভিভাবকের কাছে, তারপর আশ্রয় খোঁজে এমন কারও কাছে যিনি সবকিছুর মালিক ও পরিচালক-সবশেষে সে অন্তর থেকে ভালোবেসে নতজানু হয় তারই সামনে, যাঁকে সে প্রকৃত প্রভু বলে মানে । ‘ইলাহ’ মানে ঠিক এই শেষ স্তরের সত্তা-যাঁকে মানুষ ভালোবাসে, যাঁর কাছেই সব প্রয়োজনে আশ্রয় নেয়, যাঁর ইবাদত করে । আয়াতটি বলছে, মানুষের সেই একমাত্র সত্য মা’বুদ আল্লাহ্, তিনি ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় ।
‘রব’, ‘মালিক’ আর ‘ইলাহ’-এই তিন গুণ একসঙ্গে কেন বলা হলো?
ইবন কাসীর বলেন, এই সূরায় আল্লাহর তিনটি গুণ একসঙ্গে এসেছে-তিনি পালনকর্তা, শাহানশাহ ও মা’বুদ; সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তাঁর মালিকানাধীন, সবাই তাঁর আনুগত্যাধীন । আবু বকর যাকারিয়া যোগ করেন, এই তিন গুণে গুণান্বিত মহান সত্তার কাছেই আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ সব কিছুই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর মালিকানাধীন, তাঁর বান্দা । বিকাঈ দেখান, তিনটি গুণ পরস্পরকে অনিবার্য করে-রুবুবিয়্যাত মালিকিয়্যাতকে টেনে আনে, আর মালিকিয়্যাত ইলাহিয়্যাতকে; ফলে আশ্রয়প্রার্থীর সামনে আল্লাহর পূর্ণ পরিচয় ফুটে ওঠে ।
‘ইলাহ’ গুণটাকেই কেন সবার শেষে রাখা হলো?
যামাখশারী ও বিকাঈ এর কারণ খোলাসা করেন: ‘রব’ বা ‘মালিক’ শব্দটি কখনো রূপকার্থে মানুষের ক্ষেত্রেও বলা চলে, কিন্তু ‘ইলাহ’ একান্তভাবে আল্লাহরই-এতে কারও অংশীদারিত্বের অবকাশ নেই । তাই বর্ণনাকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন স্তরে পৌঁছে দিতে একে সর্বশেষে ‘গায়াতুল বায়ান’ অর্থাৎ বর্ণনার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে রাখা হয়েছে । বিকাঈ আরও বলেন, ইলাহিয়্যাত শেষে এসেছে তার বিশেষত্বের কারণে, কারণ যে ব্যক্তি তাঁর আদেশ-নিষেধ মানে না সে নিজেই নিজেকে তাঁকে মা’বুদ বানানোর বাইরে নিয়ে যায়-যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই ।
একই ‘মানুষ’ শব্দ তিনবার আনার দরকার কী ছিল-একবার বললেই তো হতো?
এ এক চমৎকার অলংকারিক প্রশ্ন, যা যামাখশারী নিজেই তোলেন। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আতফে বায়ান’ বা ব্যাখ্যামূলক সংযোজনের কাজই হলো স্পষ্ট করা, তাই এখানে গোপন সর্বনামের (ইযমার) বদলে প্রকাশ্য নামের (ইযহার) পুনরাবৃত্তিই উপযুক্ত । বিকাঈ আরও গভীরে গিয়ে দেখান, ‘ইলাহুহুম’ না বলে বারবার ‘নাস’ উচ্চারণ করায় মানুষের তীব্র মুখাপেক্ষিতা ও অস্থিরতা ফুটে ওঠে, আর বোঝা যায় আল্লাহ্ প্রতিটি দিক থেকেই তাদের পরিচালক । এই পুনরাবৃত্তি মানুষের মর্যাদা ও তার প্রতি বিশেষ যত্নকেও তুলে ধরে ।
এই আয়াতের সঙ্গে পরের আয়াতে আসা ওয়াসওয়াসার সম্পর্ক কী?
যামাখশারী বলেন, পুরো আশ্রয়-প্রার্থনাটিই হয়েছে সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের বুকে ফিসফিস করে; তাই মানুষ আশ্রয় নেয় তাদের সেই রবের কাছে যিনি তাদের সব ব্যাপারের মালিক, যিনি তাদের ইলাহ ও মা’বুদ । ইবন কাসীর দেখান, এই গোপন শত্রু মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করলে পিছিয়ে যায়, আর ভুলে গেলেই ফিরে এসে অন্তরে থাবা বসায়-এটাই ‘ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস’ । অর্থাৎ আগে আল্লাহর পূর্ণ পরিচয় (রব-মালিক-ইলাহ) দৃঢ় করে নেওয়া হলো, যাতে এই শত্রুর বিরুদ্ধে আশ্রয় হয় সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ ।
আশ্রয় চাওয়ার জন্য এই গুণগুলোই কেন বেছে নেওয়া হলো?
আহসানুল বায়ান বলেন, যিনি সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা এবং যাঁর হাতে গোটা দুনিয়ার বাদশাহী, একমাত্র তিনিই সব ইবাদত পাওয়ার যোগ্য একক মা’বুদ-তাই বান্দা বলে, ‘আমি সেই সুমহান সত্তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’ । বিকাঈ দেখান, এই তিন গুণে আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের অর্থ নিহিত এবং ঈমানের সব মূলনীতি গাঁথা আছে; ‘ইলাহ’ শব্দটিই সব কামাল ও জালালের গুণের সমাহার, তাই এতে সব আসমাউল হুসনা ঢুকে পড়ে । এমন পূর্ণতার অধিকারীর কাছেই আশ্রয় চাওয়া বান্দার জন্য সবচেয়ে যথার্থ, কারণ এই ত্রিগুণের ক্রমই তাঁর একত্ববাদের সবচেয়ে নিখুঁত প্রমাণ ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
এই আয়াতে আশ্রয় চাওয়ার আসল কারণটি উন্মোচিত হলো-যার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে রব, মালিক ও মা'বুদের কাছে শরণ নেওয়া হলো, সে হলো ওয়াসওয়াসুল খান্নাস। ওয়াসওয়াস (الوَسواس) শব্দটি কিছু আলিমের মতে ইসম ফায়িল মুওয়াসবিস (مُوَسوِس), অর্থাৎ কুমন্ত্রণাদাতার অর্থে; আবার কারো মতে এর মূল ‘যিল-ওয়াসওয়াস’ (ذو الوسواس)-কুমন্ত্রণার অধিকারী । ওয়াসওয়াসা মানে গোপন, চাপা স্বর; অলংকারের ঝংকার বা মনের ফিসফিসানির মতো শয়তান যে অলক্ষ্য পথে অন্তরে নানা প্রলোভন ফেলে । তাকে তার কর্ম দিয়েই নাম দেওয়া হয়েছে-যেমন বিচারককে ‘আদল’ বলা হয়-কারণ এই কুমন্ত্রণাই তার আজীবনের পেশা । খান্নাস (الخَنّاس) মানে সরে-পড়া, পিছিয়ে-যাওয়া যার স্বভাব । তার রহস্য একটিই: আল্লাহর যিকর হলেই সে গুটিয়ে যায়, পিছু হটে; আর মানুষ গাফিল হলেই ফিরে এসে অন্তরে ছেয়ে যায় । হাদীসে এসেছে, প্রত্যেকের সঙ্গে একজন শয়তান নিযুক্ত আছে । ইবন আব্বাসের বর্ণনায়, সে আদম-সন্তানের অন্তরে থাবা গেড়ে রাখে-মানুষ গাফিল হলে কুমন্ত্রণা দেয়, আল্লাহকে স্মরণ করলে পিছিয়ে যায় । তাই এই শত্রু থেকে রক্ষার একমাত্র অস্ত্র যিকর-আল্লাহর স্মরণই শয়তানকে তাড়ায় ও অন্তরকে আলোকিত করে ।
ওয়াসওয়াস (الوَسواس) শব্দটি গঠনে অর্থানুকারী-‘ওয়াস-ওয়াস’ দ্বিরুক্ত অক্ষরে চাপা, পুনরাবৃত্ত ফিসফিসানিরই ধ্বনি, যেমন যিলযাল মানে ঝাঁকুনি; দ্বিরুক্ত শব্দ দ্বিরুক্ত অর্থ বহন করে, কারণ কুমন্ত্রণাদাতা গোপনে বারবার একই কথা অন্তরে ছুঁড়ে দেয় । শয়তানকে তার কর্ম দিয়েই নাম দেওয়া-ওয়াসওয়াস ও খান্নাস-অতিশয়োক্তির ভঙ্গি, যেন কুমন্ত্রণাই তার সত্তা । খান্নাস (الخَنّاس)-এও মুবালাগার গঠন: সরে-পড়া তার স্থায়ী অভ্যাস । যামাখশারীর মতে الَّذِي يُوَسوِس-এ তিন প্রকার ই'রাব সম্ভব-জার্ বিশেষণ হিসেবে, আর রফ্ ও নসব শয়তানকে গালি-নিন্দা অর্থে; পাঠক ‘খান্নাস’-এ থেমে ‘আল্লাযী’ থেকে শুরু করতে পারেন ।
পূর্ববর্তী তিন আয়াতে আল্লাহর তিন গুণ-রব (رب), মালিক (مَلِك) ও ইলাহ (إله)-ক্রমে উচ্চারিত হয়ে আশ্রয় প্রার্থনা পূর্ণ হলো; এরপরই এই আয়াতে বলা হলো কার অনিষ্ট থেকে আশ্রয়-‘মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস’ । আল-বিকাঈ দেখান, ইহসান, মহত্ত্ব বা কর্তৃত্বের সব দিক থেকে আশ্রয় পূর্ণ করার পরই মুস্তা'আয মিনহু-যার থেকে আশ্রয়-কে আনা হলো । যামাখশারীর সূক্ষ্ম মুনাসাবা: রব, মালিক ও ইলাহ বিশেষভাবে ‘নাস’ (মানুষ)-এর দিকে সম্বন্ধিত করা হয়েছে, কারণ আশ্রয়টাই তো মানুষের বুকে কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে; তাই যিনি মানুষের যাবতীয় বিষয়ের মালিক, সেই রবের কাছেই শরণ । আর পরের আয়াত ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু ফী সুদূরিন নাস’ এই খান্নাসেরই কাজকে খুলে বলে-সে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা ঢালে ।
কল্পনা করুন এমন এক শত্রুকে, যে কখনো সামনে এসে লড়ে না। সে আসে নিঃশব্দে, বুকের ভিতরে চাপা গলায় ফিসফিস করে-এই কাজটা করেই ফেলো, একটু তো দোষ নেই-আর তারপর গা ঢাকা দেয়। এ-ই হলো ওয়াসওয়াসুল খান্নাস। ওয়াসওয়াস (الوَسواس) মানে সেই গোপন কুমন্ত্রণা, যা অলংকারের চাপা ঝংকারের মতো অলক্ষ্যে অন্তরে এসে পড়ে [২][৬]; আর খান্নাস (الخَنّاس) মানে সরে-পড়া, পিছিয়ে-যাওয়া যার চিরস্বভাব [১][২]। এই দুই নামই আসলে শয়তানের কর্মের নাম-কুমন্ত্রণাই তার পেশা, পিছিয়ে যাওয়াই তার কৌশল [৬][৭]। তার একটিমাত্র দুর্বলতা ধরিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ: মানুষ যখন তাঁকে স্মরণ করে, তখন সে গুটিয়ে পিছিয়ে যায়; আর মানুষ যেই গাফিল হয়, সে ফিরে এসে অন্তর জুড়ে বসে [২][৩][৪]। ইবন আব্বাসের কথায়, সে আদম-সন্তানের অন্তরে থাবা গেড়ে রাখে; ভুল ও উদাসীনতার ফাঁকেই কুমন্ত্রণা ঢালে, আর যিকরের সামনে কেটে পড়ে [৪]। তাই আগের আয়াতগুলোয় রব, মালিক ও ইলাহ-মানুষের প্রতিপালক, অধিপতি ও মা'বুদ-কে ডেকে আশ্রয় চাওয়ার পর এখানে বলা হলো ঠিক কার থেকে সেই আশ্রয় [৬][৭]। আর পরের আয়াত এই খান্নাসের কাজটাই খুলে দেখাবে-সে মানুষের বুকে কুমন্ত্রণা ঢালে [৪][৬]। সব মিলিয়ে শিক্ষা একটাই: এই লুকোনো শত্রুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র আল্লাহর স্মরণ, কারণ যিকরই শয়তানকে তাড়ায় ও অন্তরকে আলোকিত করে [৭]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
ওয়াসওয়াসুল খান্নাস ব্যাপারটা সহজ করে বললে কেমন?
ভাবুন, ঘরে কেউ গোপনে ঢুকে কানে কুপরামর্শ দিয়ে, পায়ের শব্দ না তুলে সরে পড়ছে; আপনি বাতি জ্বালালেই সে গা ঢাকা দেয়, অন্ধকার হলেই আবার ফেরে। শয়তানও তেমন: গোপন ফিসফিসানিতে অন্তরে কুমন্ত্রণা ঢালে , আর আল্লাহর যিকরের ‘আলো’ পেলেই সরে যায়, গাফিলতির অন্ধকারে আবার ফিরে আসে । অলংকারের চাপা ঝংকারের মতো তার স্বরও অলক্ষ্য । ইবন আব্বাসের বর্ণনায় সে অন্তরে থাবা গেড়ে রাখে, ভুলের ফাঁকে কুমন্ত্রণা দেয়, আর স্মরণের সামনে কেটে পড়ে ।
‘খান্নাস’ শব্দটির অর্থ ঠিক কী, আর শয়তানকে এই নামে ডাকা হলো কেন?
খান্নাস (الخَنّاس) এসেছে ‘খুনূস’ থেকে, যার অর্থ পিছিয়ে যাওয়া, সরে পড়া, গা ঢাকা দেওয়া । শব্দের গড়নটাই মুবালাগার-অর্থাৎ যার অভ্যাসই হলো বারবার সরে যাওয়া । নামকরণের কারণ তার আচরণে: আল্লাহর যিকর হলেই সে গুটিয়ে পিছিয়ে যায়, আর মানুষ স্মরণ থেকে উদাসীন হলেই ফিরে এসে অন্তরে ছেয়ে যায় । বিকাঈ বলেন, যিকর তার কাছে যেন হাতুড়ির মতো যা তাকে দমন করে, তাই সে যিকর থেকে ভীষণ পালায়-এ কারণেই মুমিনের শয়তান থাকে দুর্বল, রোগা ।
‘ওয়াসওয়াস’ শব্দটি নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতভেদ আছে কেন?
কিছু আলিমের মতে ওয়াসওয়াস (الوَسواس) এখানে ইসম ফায়িল-অর্থাৎ মুওয়াসবিস (مُوَسوِس), কুমন্ত্রণাদাতা; আবার কারো মতে এর মূল ‘যিল-ওয়াসওয়াস’ (ذو الوسواس), কুমন্ত্রণার অধিকারী । যামাখশারী ও বিকাঈ ব্যাখ্যা করেন, ওয়াসওয়াস মূলত একটি নাম যার অর্থ ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা)-যেমন ‘যিলযাল’ মানে ঝাঁকুনি; এখানে শয়তানকে তার কর্ম দিয়েই নাম দেওয়া হয়েছে, কারণ কুমন্ত্রণা ঢালাই তার আজীবনের পেশা ও স্বভাব । মাসদার বা ক্রিয়ামূল হিসেবে অবশ্য ‘ওয়িসওয়াস’ (কাসরাযুক্ত) পড়া হয়, যেমন ‘যিলযাল’ ।
এই কুমন্ত্রণাদাতার থেকে বাঁচার উপায় কী?
সূত্রগুলোর কেন্দ্রীয় উত্তর একটাই-আল্লাহর যিকর বা স্মরণ। বিকাঈ বলেন, রাজাধিরাজ আল্লাহ এমন কোনো রোগ নামাননি যার ওষুধ নামাননি; আর কুমন্ত্রণার ওষুধ বানিয়েছেন তাঁর স্মরণকে, কারণ যিকর শয়তানকে তাড়ায়, অন্তরকে আলোকিত ও নির্মল করে । আহসানুল বায়ান ও মুখতাসারও বলে, কোনো স্থানে আল্লাহর যিকর হলে শয়তান সরে পড়ে, আর মানুষ গাফিল হলে অন্তরে ছেয়ে যায় । ইবন কাসীরের বর্ণনায়, মানুষ আল্লাহর ইবাদত করলে সে অন্তর থেকে হাত সরিয়ে নেয়, আর ভুলে গেলে অন্তরের উপর পূর্ণ আধিপত্য পায় ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গেও কি শয়তান ছিল?
হাদীসে এসেছে, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই একজন শয়তান নিযুক্ত করা হয়েছে; সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন-‘আপনার সঙ্গেও?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে আমি নিরাপদ এবং সে কেবল ভালো কাজের কথাই বলে’ । এ থেকে বোঝা যায়, সঙ্গী-শয়তান থাকা মানেই পরাজয় নয়; আল্লাহর সাহায্য ও স্মরণে সে নিয়ন্ত্রিত হয়, এমনকি কল্যাণের দিকেই পরিণত হতে পারে। তাই এই শত্রুর উপস্থিতিতে ভয় নয়, বরং রবের আশ্রয়ই মুমিনের ভরসা ।
এই কুমন্ত্রণা থেকে কী কী অনিষ্ট জন্ম নেয়?
বিকাঈ বিস্তারিত বলেন-শয়তান গোপনে গুনাহকে সাজিয়ে, প্রবৃত্তি উসকে মানুষকে পাপে ফেলে, এরপর তা ফাঁস করে আরো বেহায়া করে তোলে । সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো অহংকার ও আত্মতুষ্টি-এই দুটিই ইবলিসকে ধ্বংস করেছিল; এ থেকে জন্মে হিংসা, বিদ্বেষ, সত্য প্রত্যাখ্যান, কুফর, ফিসক ও অবাধ্যতা, মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান-যেমন শয়তানের ‘আমি তার চেয়ে উত্তম’ । আদম আলাইহিস সালামের ঘটনায় কসম খেয়ে ধোঁকা, মিথ্যা ও সম্পর্ক নষ্টের নমুনাও সে দেখায় । মূলে সে আকীদা, আখলাক, আমল-সবকিছু নষ্ট করতে চায়, কিন্তু সদিচ্ছার মানুষ চিকিৎসায় সারে ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
সূরা আন-নাসের পঞ্চম আয়াত আগের আয়াতে উল্লেখিত সেই কুমন্ত্রণাকারীর পরিচয় স্পষ্ট করছে-আল্লাযী ইউওয়াসবিসু ফী সুদূরিন নাস (الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ), যে মানুষের বুকের ভেতরে গোপনে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয় । মুফাসসিরগণের সম্মিলিত ব্যাখ্যায় ‘ওয়াসওয়াসা’ (وَسْوَسَة) মানে এমন এক চাপা, অস্ফুট ফিসফিসানি, যা ক্ষতিকর অর্থগুলোকে গোপনে ও বারবার আবৃত্তি করে অন্তরে পৌঁছে দেয়-কোনো শব্দ শোনা ছাড়াই তার মর্ম পৌঁছে যায় । তাফসীরে জালালাইন এই আয়াতে ‘সুদূর’-কে ‘কুলূব’ অর্থাৎ অন্তর বলে ব্যাখ্যা করে শর্ত যোগ করেছেন-এই কুমন্ত্রণা তখনই কার্যকর হয় যখন মানুষ আল্লাহর যিকর থেকে গাফেল হয়ে পড়ে । ইবনে কাসীর এই সত্যকেই বিস্তৃত করেছেন: শয়তান আদম-সন্তানের অন্তরে যেন থাবা বসিয়ে রাখে; মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে তখন সে গুটিয়ে যায়, আর যখন সে আল্লাহকে ভুলে যায় তখন সে অন্তরের উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করে-এটিই ‘ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ । বিকাঈ লক্ষ করেছেন, ‘সুদূর’ (বুক) শব্দটি ব্যবহারের কারণ-বুক হলো অন্তরের আঙিনা ও আবাসস্থল, যার ভেতর দিয়ে বাইরের প্রভাবগুলো অন্তরে ঢোকে; শব্দটি কুমন্ত্রণার আধিক্যের প্রতি ইঙ্গিত দেয় । সব মিলিয়ে আয়াতটি দেখায়-শত্রুর আক্রমণস্থল মানুষের সবচেয়ে গোপন অভ্যন্তর, আর তার একমাত্র প্রতিষেধক আল্লাহর স্মরণ ও আশ্রয়প্রার্থনা।
এই আয়াতে ‘আন-নাস’ (النَّاس) শব্দের পুনরাবৃত্তি সমগ্র সূরার এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য; প্রথম তিন আয়াতে রব, মালিক ও ইলাহ-এই তিন গুণের সঙ্গেই ‘নাস’ যুক্ত হয়েছে আশ্রয়প্রার্থনার রীতি ও আবেগের পূর্ণতার জন্য, কেননা যে শত্রু থেকে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে সে মানুষের বুকেই কুমন্ত্রণা দেয় । ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু’ (الَّذِي يُوَسْوِسُ)-এই ‘আল্লাযী’ পদে তিনটি ই‘রাব সম্ভব: জার (বিশেষণরূপে খান্নাসের সঙ্গে), রফ‘ ও নসব (নিন্দাসূচক)-আর তাই পাঠকের জন্য ‘খান্নাস’-এ থেমে ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু’ থেকে আবার শুরু করা উত্তম । ‘সুদূর’ (বুক) শব্দটি ‘কুলূব’ (অন্তর)-এর বদলে আনা হয়েছে কুমন্ত্রণার আধিক্য ও তার প্রবেশপথ বোঝাতে । ‘ওয়াসওয়াসা’ শব্দটি নিজেই অনুকরণমূলক-চাপা, লুকানো স্বর, যেমন গয়নার মৃদু ঝঙ্কার ।
আয়াতটি আগের ও পরের আয়াতের মাঝখানে এক সেতুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আগের আয়াতে শত্রুকে নাম দেওয়া হয়েছিল গুণ দিয়ে-‘আল-ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ (الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ), সেই কুমন্ত্রণাকারী যে আত্মগোপন করে; বিকাঈ লক্ষ করেছেন, আগের আয়াতে যখন আশ্রয়প্রার্থিত শত্রুর গুণ বর্ণিত হলো, তখন এই আয়াতে এসে সেই গুণের কার্যকর প্রকাশকে-অর্থাৎ সে আসলে কী করে তা-তুলে ধরা হলো । ‘খান্নাস’ ও ‘ইউওয়াসবিসু’-এর সম্পর্কও স্পষ্ট: বান্দা যখন রবকে স্মরণ করে তখন সে গুটিয়ে যায় (খান্স), আর গাফলতের মুহূর্তে আবার কুমন্ত্রণা দেয় । আর পরের আয়াত ‘মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস’ (مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ) এই কুমন্ত্রণাকারীর বিবরণ (বায়ান) হিসেবে আসছে-দেখাচ্ছে এই শয়তান দুই রকম: জিন্ন ও মানুষ উভয়ের মধ্য থেকে ।
আগের আয়াতে আমরা শত্রুর নাম পেয়েছিলাম গুণের আড়ালে-সে এমন এক ফিসফিসানিদাতা, যে আঘাত হেনেই সরে পড়ে। এই আয়াত সেই আড়াল সরিয়ে দেখায় সে আসলে কী করে: মানুষের বুকের ভেতরে, একেবারে গোপন প্রকোষ্ঠে, ক্ষতিকর ভাবনাগুলো নিঃশব্দে আর বারবার ঢেলে দেয়-কোনো কণ্ঠস্বর কানে আসে না, অথচ অর্থটা ঠিক অন্তরে পৌঁছে যায় [৬][৭]। লক্ষণীয়, এখানে ‘অন্তর’ না বলে ‘বুক’ বলা হয়েছে; বিকাঈর ভাষায় বুক হলো অন্তরের আঙিনা, যার বারান্দা দিয়ে বাইরের সব প্রভাব ভেতরে ঢোকে-শব্দটি বুঝিয়ে দেয় কুমন্ত্রণা ঠিক কোন দরজা দিয়ে আসে এবং তা কত বিপুল [৭]। কিন্তু এই শত্রুর শক্তি নিরঙ্কুশ নয়। জালালাইন একটিমাত্র শর্তে গোটা চিত্রটা পাল্টে দেন-এই কুমন্ত্রণা কার্যকর হয় কেবল তখনই যখন মানুষ আল্লাহর যিকর থেকে উদাসীন হয় [৫]। ইবনে কাসীর সেই কথাকেই জীবন্ত করে তোলেন: শয়তান যেন অন্তরের উপর হাত রেখে বসে আছে; বান্দা আল্লাহকে স্মরণ করলে সে হাত গুটিয়ে পিছিয়ে যায় (এটিই তার ‘খান্স’), আর বান্দা ভুলে গেলে সে অন্তরে কর্তৃত্ব কায়েম করে-এর নামই ‘ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ [৪]। তাই পরের আয়াত যখন বলে এই শত্রু জিন্ন ও মানুষ-দুই জাতের মধ্যেই আছে [৬][৪], তখন গোটা ছবিটা সম্পূর্ণ হয়: লড়াইটা বাইরে নয়, একেবারে বুকের ভেতরে; আর সেই গোপন রণক্ষেত্রে মানুষের একমাত্র ঢাল রবের স্মরণ ও তাঁরই কাছে আশ্রয় চাওয়া।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
এই আয়াতটি সহজ করে বুঝতে একটা দৈনন্দিন দৃশ্য দিয়ে বললে কেমন হয়?
ভাবুন, আপনি একা ঘরে শান্ত মনে বসে আছেন, হঠাৎ ভেতর থেকে কেউ যেন চুপিচুপি বলতে থাকে-‘থাক, আজ নামাজটা পরে পড়ো’, কিংবা ‘ওই কথাটা বলে দাও না’। কোনো গলা কানে আসে না, তবু ভাবনাটা ঠিক বুকে গেঁথে যায়। এটাই ‘ওয়াসওয়াসা’ (وَسْوَسَة)-চাপা, লুকানো এক ফিসফিসানি, যা ক্ষতিকর অর্থ নিঃশব্দে ও বারবার অন্তরে পৌঁছে দেয় । বিকাঈ বলেন, বুক হলো অন্তরের আঙিনা, যার বারান্দা দিয়েই এসব ভেতরে ঢোকে । আর ইবনে কাসীরের চিত্রটি স্মরণীয়-আপনি আল্লাহকে স্মরণ করলে সেই ফিসফিসানি পিছিয়ে যায়, ভুলে গেলে আবার ফিরে এসে চেপে বসে ।
আয়াতে ‘অন্তর’ না বলে ‘বুক’ (সুদূর) বলা হলো কেন?
বিকাঈ এর সূক্ষ্ম কারণটি ধরেছেন। ‘কালব’ (قَلْب) অর্থাৎ অন্তর হলো ভেতরের গূঢ় কেন্দ্র, আর ‘সাদ্র’ (صَدْر) বা বুক হলো সেই অন্তরের আঙিনা ও আবাসস্থল-অন্তরে ঢোকার দরজা ও বারান্দা যেন এই বুক। বাইরের যত প্রভাব, তা প্রথমে এই বুক দিয়েই প্রবেশ করে তারপর অন্তরে পৌঁছায় । তাই ‘বুকের ভেতরে কুমন্ত্রণা’ বলার অর্থ-শয়তান একেবারে প্রবেশপথেই হানা দেয়। বিকাঈ আরও বলেন, ‘সুদূর’ শব্দটি কুমন্ত্রণার আধিক্যের প্রতিও ইঙ্গিত করে । জালালাইন আবার সরাসরি ‘সুদূর’-কে ‘কুলূব’ অর্থাৎ অন্তর বলে ব্যাখ্যা করেছেন, কেননা শেষ লক্ষ্য তো অন্তরই ।
এই কুমন্ত্রণা কি সবসময় সমান জোরে চলে, নাকি কোনো নির্দিষ্ট সময়ে?
না, এটি সর্বক্ষণ সমান নয়-এর একটি স্পষ্ট শর্ত আছে। জালালাইন আয়াতের ব্যাখ্যায় যোগ করেছেন: এই কুমন্ত্রণা তখনই কার্যকর হয় ‘যখন তারা আল্লাহর যিকর থেকে গাফেল হয়’ । ইবনে কাসীর সাঈদ ইবনে জুবায়রের সূত্রে একই কথা টেনেছেন-মানুষ যখন রবকে স্মরণ করে শয়তান গুটিয়ে পিছিয়ে যায়, আর গাফেল হলেই কুমন্ত্রণা দেয় । তিনি আরও বর্ণনা করেন, শয়তান যেন অন্তরের উপর হাত রেখে বসে থাকে; ইবাদতের সময় হাত সরায়, আল্লাহকে ভুললে চেপে বসে-এটিই ‘ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ । তাই গাফলত তার দরজা, আর যিকর তার তালা।
আগের আয়াতে ‘খান্নাস’ আর এই আয়াতে ‘ইউওয়াসবিসু’-এই দুটোর সম্পর্ক কী?
দুটো আসলে একই শত্রুর দুই গতিভঙ্গি, যা পরস্পরের পরিপূরক। ‘খান্নাস’ (الْخَنَّاس) মানে যে গুটিয়ে যায়, পিছিয়ে আত্মগোপন করে; আর ‘ইউওয়াসবিসু’ (يُوَسْوِسُ) মানে যে গোপনে কুমন্ত্রণা ঢালে। জামাখশারী দেখান, এই দুই গুণ একসঙ্গে কাজ করে-বান্দা রবকে স্মরণ করলে সে ‘খান্স’ করে সরে যায়, আর গাফলতের মুহূর্তে আবার ‘ওয়াসওয়াসা’ নিয়ে ফিরে আসে । বিকাঈ এই ক্রমটিকে বলেন-আগের আয়াতে শত্রুর গুণ বর্ণিত হলো, আর এই আয়াতে সেই গুণের কার্যকর প্রকাশ, অর্থাৎ সে বাস্তবে কী করে, তা তুলে ধরা হলো ।
আয়াতের শব্দবিন্যাসে ভাষাশৈলীগত কোনো বিশেষত্ব আছে কি?
হ্যাঁ, জামাখশারী কয়েকটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রথমত, ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু’ (الَّذِي يُوَسْوِسُ)-তে ‘আল্লাযী’ পদে তিন রকম ই‘রাব সম্ভব-জার (খান্নাসের বিশেষণরূপে), রফ‘ ও নসব (নিন্দাসূচক হিসেবে); আর তাই তিলাওয়াতে ‘খান্নাস’-এ থেমে এখান থেকে নতুন করে শুরু করা শ্রুতিমধুর । দ্বিতীয়ত, ‘ওয়াসওয়াস’ (وَسْوَاس) শব্দটি অনুকরণমূলক-চাপা, লুকানো স্বর বোঝায়, যেমন গয়নার মৃদু ঝঙ্কারকেও ‘ওয়াসওয়াস’ বলা হয় । আর সমগ্র সূরায় ‘নাস’ (النَّاس) শব্দের পুনরাবৃত্তি আশ্রয়প্রার্থনার আবেগকে পূর্ণতা দেয়, কেননা শত্রু এই মানুষেরই বুকে হানা দেয় ।
পরের আয়াত ‘জিন্ন ও মানুষের মধ্য থেকে’ এই কুমন্ত্রণার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত?
পরের আয়াত ‘মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস’ (مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ) এই কুমন্ত্রণাকারীর পরিচয়-বিবরণ (বায়ান) হিসেবে আসছে-দেখাচ্ছে শত্রু এক প্রকার নয়, দুই প্রকার: জিন্ন শয়তান ও মানুষ শয়তান । ইবনে কাসীর অন্য আয়াত টেনে এনে স্পষ্ট করেন-‘মানব ও দানব শয়তানরা’ একে অপরকে চমকপ্রদ কথা সাজিয়ে ধোঁকা দেয় (৬:১১২) । অর্থাৎ কুমন্ত্রণা কেবল অদৃশ্য জিন্নের কাজ নয়; কোনো মানুষও যখন আপনার কানে কুপরামর্শ সাজিয়ে দেয়, সেও এই ‘ওয়াসওয়াসা’র বাহক। জামাখশারী আবু যারের সেই উক্তিও স্মরণ করান-‘তুমি কি মানুষ-শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছ?’ ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
▶তাফসীর সামারি
শেষ আয়াত মিনাল জিন্নাতি ওয়ান-নাস (مِنَ الجِنَّةِ والنّاسِ) আগের আয়াতের সেই কুমন্ত্রণাদাতাকে চিহ্নিত করে দেয়-সে দুই জাতের: জিন (الجِنَّة) থেকে আর মানুষ (النّاس) থেকে । মুফাসসিরগণ এখানে দুটি ব্যাখ্যা দেন। প্রথমত, এটি ওয়াসওয়াস (الوَسواس)-এর বিবরণ-অর্থাৎ কুমন্ত্রণাকারী শয়তান জিন্নি ও ইনসি দুই রকমই, যেমন কুরআনের অন্যত্র এসেছে শায়াতীনুল ইনসি ওয়াল-জিন্ন (شَياطِين الإنس والجِنّ) । দ্বিতীয়ত, এটি আগের আয়াতের 'নাস' শব্দটিরই বিবরণ-অর্থাৎ জিনও 'নাস' শব্দের অন্তর্ভুক্ত, যেমন সূরা জিনে তাদের জন্য রিজাল (رِجال) ও নাফার (نَفَر) ব্যবহৃত হয়েছে । ইবন কাসীর প্রথম মতকেই শক্তিশালী বলেছেন-কুমন্ত্রণাকারী জিন থেকেও হয়, মানুষ থেকেও । আবু বকর যাকারিয়া এর সঙ্গে যোগ করেন: শয়তান যেমন বাইরে থেকে মনে কথা ফেলে, তেমনি মানুষের নিজের নফসও কুমন্ত্রণা দেয়, তাই রাসূল (সা.) নিজ নফসের অনিষ্ট থেকেও আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন । আল-বিকাঈ মানুষ-শয়তানকে 'অধিক ক্ষতিকর' বলে আগে এনেছেন বলে মত দেন এবং এর প্রতিকার হিসেবে সঙ্গ-পরিত্যাগের কথা বলেন । এভাবে সূরাটি শেষ হয় ঠিক সেই বিন্দুতে-আশ্রয়প্রার্থনার-যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ।
আয়াতটি বয়ান (بَيان)-আগের আয়াতের অস্পষ্ট কুমন্ত্রণাকারীকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে: সে জিন্নি ও ইনসি । জালালাইন ও যামাখশারী দেখান যে 'মিন' (مِن)-কে দুইভাবে পড়া যায়-হয় ওয়াসওয়াসের বয়ান (এটি দুই জাতের), নয়তো 'ইউওয়াসউইসু'র সঙ্গে যুক্ত করে 'কুমন্ত্রণার উৎস' অর্থে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নাস (النّاس)-এর উপর আতফ হয় । যামাখশারী একটি সূক্ষ্ম আপত্তি ও সমাধানও তুলে ধরেন-'মানুষ তো মনে কুমন্ত্রণা দেয় না'-যার জবাব: মানুষ বাইরে থেকে এমন কথা বলে যা পরে হৃদয়ে গিয়ে গাঁথে । আল-বিকাঈ লক্ষ করেন আহাম্ম ও আদার্র (الأهَمّ الأضَرّ)-অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক ক্ষতিকরকে আগে আনার অলংকার । সর্বোপরি সূরার মাকতা' (শেষ) আবার ফিরে আসে মাতলা'য় (শুরুতে), আর সমাপ্তি মিলে যায় ফাতিহার সূচনার সঙ্গে-খুতিমাতিস সূরাতু বিমা বুদিয়াত বিহি (خُتِمَت السُّورَة بِما بُدِئَت بِهِ) ।
আগের আয়াতে বলা হয়েছিল আল্লাযী ইউওয়াসউইসু ফী সুদূরিন-নাস-যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়; কিন্তু সেই 'যে'-টি কে, তা ছিল অনুক্ত। এই শেষ আয়াত সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়: সে জিন থেকেও আসে, মানুষ থেকেও । আল-বিকাঈ এটিকে আগের আয়াতের সরাসরি বয়ান হিসেবে দেখেন-যেখানে জিন-শয়তানের মতো মানুষ-শয়তান থেকেও সতর্ক করা হয়েছে, এবং অধিক ক্ষতিকরটিকে আগে আনা হয়েছে । সামনে আর কোনো আয়াত নেই-এটিই কুরআনের শেষ শব্দ। তাই মুনাসাবার সবচেয়ে চমৎকার দিকটি আল-বিকাঈ এখানেই খোলেন: সূরার শেষ ফিরে আসে তার শুরুতে (আশ্রয়প্রার্থনায়), আর তিন নাম রব-মালিক-ইলাহ (رَبّ، مَلِك، إله) মিলে যায় ফাতিহার আল্লাহ-রব-মালিক-এর সঙ্গে, যেন কুরআনের শেষ প্রান্ত তার সূচনার সঙ্গে গাঁট বেঁধে দেয় ।
পুরো সূরাটা যেন একটা প্রশ্নের চারপাশে ঘোরে-কার কাছে আশ্রয়, আর কীসের অনিষ্ট থেকে? আগের আয়াত পর্যন্ত আমরা জেনেছি একজন আছে, যে চুপিসারে মানুষের বুকের ভেতর কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়, আল্লাহকে স্মরণ করলে সরে যায়, ভুলে গেলে আবার ফিরে আসে। কিন্তু সে আসলে কে? এই শেষ আয়াত পর্দাটা তুলে দেয়: সে এক জাতের নয়-কখনো সে জিন, অদৃশ্য থেকে মনের ভেতর কথা ফেলে; আবার কখনো সে রক্তমাংসের মানুষ, যে হিতাকাঙ্ক্ষী ও দরদির মুখোশ পরে এসে ভালো কথার আড়ালে বিপথে টানে [১][২][৪]। যামাখশারী যে সূক্ষ্ম প্রশ্নটা তোলেন-মানুষ তো অন্যের বুকের ভেতরে ঢুকে কুমন্ত্রণা দিতে পারে না-তার জবাবও সুন্দর: মানুষ বাইরে থেকে এমন কথা বলে যা ধীরে ধীরে হৃদয়ে পৌঁছে সেখানে গেঁথে যায় [৫]। আর আবু বকর যাকারিয়া আরেক স্তর যোগ করেন-সবচেয়ে কাছের শত্রু তো নিজের নফসই, তাই রাসূল (সা.) নফসের অনিষ্ট থেকেও আল্লাহর আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন [১]। আল-বিকাঈ বলেন, এজন্যই অধিক ক্ষতিকর মানুষ-শয়তানকে এখানে আগে আনা হয়েছে, আর তার ওষুধ হলো এমন সঙ্গ এড়িয়ে চলা [৭]। আর ঠিক এখানেই কুরআন থামে-কোনো বিজয়ের ঘোষণায় নয়, বরং বান্দার দুর্বলতা স্বীকার করে রবের কোলে আশ্রয় নেওয়ায়। আল-বিকাঈ যেমন দেখান, সূরার শেষ ফিরে যায় তার নিজের শুরুতে, আর কুরআনের শেষ প্রান্ত গাঁট বাঁধে ফাতিহার সূচনার সঙ্গে-যেন আশ্রয়প্রার্থী বান্দা আবার নতুন করে পাঠ শুরু করার জন্যই থামল [৭]।
- ১.
- ২.
- ৩.
- ৪.
- ৫.
- ৬.
- ৭.
আয়াতটা সহজ করে বোঝান-রোজকার জীবনে এর দৃশ্যটা কেমন?
ভাবুন, কেউ আপনার পাশে বসে নরম গলায়, দরদভরা মুখে বোঝাচ্ছে-'এটুকু অন্যায়ে কিছু হয় না, সবাই তো করে।' সে হয়তো বন্ধু, হয়তো আপনজন; কিন্তু তার কথাটা ধীরে ধীরে আপনার মনে গেঁথে যাচ্ছে। এটাই মানুষ-শয়তানের কুমন্ত্রণা । আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই মনের ভেতর কু-চিন্তা ফিসফিস করে-তার পেছনে অদৃশ্য জিন-শয়তান । যামাখশারী বলেন, মানুষ বাইরে থেকে কথা বলে, আর সে কথা হৃদয়ে পৌঁছে সেখানে স্থির হয়ে যায় । আয়াতটি দুই উৎসকেই চিনিয়ে দেয়, যাতে আমরা দুদিক থেকেই সতর্ক থাকতে পারি।
মানুষ তো কারো বুকের ভেতরে ঢুকতে পারে না-তাহলে মানুষকে কুমন্ত্রণাদাতা বলা হলো কেন?
এই প্রশ্নটাই যামাখশারী নিজে তুলেছেন এবং জবাব দিয়েছেন। আপত্তি হলো-কুমন্ত্রণা হয় 'সুদূরিন-নাস' অর্থাৎ হৃদয়ের ভেতরে, কিন্তু মানুষ তো অন্যের হৃদয়ে ঢুকতে পারে না, কেবল জিনই পারে । সমাধান: মানুষও কুমন্ত্রণা দেয়, তবে তার নিজস্ব ধরনে-সে বাইরে থেকে এমন কথা বলে যা মানুষের কাছে যুক্তিসংগত শোনায়, তারপর সেই কথা ধাপে ধাপে হৃদয়ে পৌঁছে সেখানে গেঁথে যায় । আহসানুল বায়ান এর রূপটা স্পষ্ট করে-এরা উপদেষ্টা, হিতাকাঙ্ক্ষী ও দয়াবানের বেশে এসে অপরকে বিপথে টানে । অর্থাৎ মুখোশটাই তার অস্ত্র।
এখানে 'নাস' মানে কি শুধু মানুষ, নাকি জিনও এর মধ্যে পড়ে?
এ নিয়ে দুই মত। অধিকতর প্রচলিত পাঠে এ আয়াত ওয়াসওয়াসের বিবরণ-কুমন্ত্রণাকারী দুই জাতের: জিন্নি ও ইনসি, যেমন কুরআন বলেছে শায়াতীনুল ইনসি ওয়াল-জিন্ন । তবে কেউ কেউ বলেন, এ আয়াত আগের 'নাস' শব্দটিরই বিবরণ-অর্থাৎ 'নাস' শব্দে জিনও অন্তর্ভুক্ত। দলিল হিসেবে তাঁরা সূরা জিন আনেন, যেখানে জিনের জন্য রিজাল ও নাফার (পুরুষ মানুষ) ব্যবহৃত হয়েছে । যামাখশারী আবার সূক্ষ্মভাবে বলেন, 'নাস' মানে এখানে 'নাসী' (যারা আল্লাহর হক ভুলে যায়) ধরাই বেশি যুক্তিসংগত, কারণ জিন ও মানুষ-উভয় শ্রেণিই বিস্মৃতির দোষে দুষ্ট ।
জিন-শয়তান আর মানুষ-শয়তান-এদের মধ্যে কে বেশি ক্ষতিকর?
আল-বিকাঈ এ প্রশ্নের একটি ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, আয়াতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক ক্ষতিকরকে আগে আনার রীতি (আল-আহাম্ম আল-আদার্র) অনুসরণ করা হয়েছে, আর তিনি মানুষ-শয়তানকে এমন বিপদ হিসেবে দেখেন যা কখনো কখনো জিন-শয়তানের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর । কারণ মানুষ-শয়তান হতে পারে স্ত্রী, সন্তান বা পরিচিতজন-যাদের সঙ্গ ছাড়া কঠিন । এর প্রতিকার হিসেবে তিনি সাধ্যমতো এদের পরিত্যাগ ও দূরত্ব রক্ষার কথা বলেন, এবং সূরা কাহফের সেই আয়াতের দিকে নির্দেশ করেন যেখানে সৎসঙ্গ ধরে রাখা ও গাফেলদের অনুসরণ এড়ানোর তাগিদ আছে ।
অদৃশ্য শয়তান যদি বুকেই বাস করে, তবে তার হাত থেকে বাঁচার উপায় কী?
ইবন কাসীর বর্ণিত একটি দৃশ্য এর সরল জবাব দেয়: শয়তান মানুষের অন্তরের উপর হাত রেখে বসে থাকে; বান্দা যখন আল্লাহর ইবাদত করে ও তাঁকে স্মরণ করে, তখন সে হাত সরিয়ে পিছিয়ে যায়; আর যখন বান্দা আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন সে আবার চেপে বসে । এটাই 'খান্নাস'-এর স্বভাব-স্মরণে পিছু হটা, গাফলতিতে ফিরে আসা । আল-বিকাঈ যোগ করেন, সতর্ক মুরাকাবা (আত্ম-পর্যবেক্ষণ) থাকলে বান্দা ক্ষতিকর কুমন্ত্রণা ঠেকিয়ে দেয়; নাহলে কু-ভাবনা হামলা করে বসে । আর মানুষ-শয়তানের ক্ষেত্রে ওষুধ সঙ্গ-পরিত্যাগ ।
কুরআন এমন একটা ছোট, সাধারণ মনে হওয়া আয়াত দিয়ে শেষ হলো কেন?
আল-বিকাঈর দৃষ্টিতে এটাই সূরার সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য। সূরার শেষ ফিরে আসে তার শুরুতে-যেখান থেকে আশ্রয়প্রার্থনা শুরু হয়েছিল, সেখানেই তা সম্পূর্ণ হলো । আরও বিস্ময়কর, কুরআনের একেবারে শেষ শব্দটি গাঁট বেঁধে দেয় ফাতিহার সূচনার সঙ্গে: এ সূরার তিন নাম রব-মালিক-ইলাহ মিলে যায় ফাতিহার আল্লাহ-রব-মালিকের সঙ্গে, যেন কুরআনের সমাপ্তি আর সূচনা এক বৃত্তে মিশে গেল । আল-বিকাঈ বলেন, খতম শেষে পাঠক যেন আবার নতুন করে পাঠ শুরু করার ইশারা পায়-তাই বিজয়ের ঘোষণায় নয়, বান্দার দুর্বলতা স্বীকার করে রবের আশ্রয়ে এসে কুরআন থামে ।
মূল তাফসীর পড়ুন▶
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com