Mankind · 6 আয়াত · মাক্কী
সব আয়াত প্রস্তুত, যাচাইের অপেক্ষায়
সূরা আন-নাসের সূচনা আশ্রয়-প্রার্থনা দিয়ে, ‘ক্বুল আউযু বিরব্বিন নাস’, বলুন, আমি মানুষের রবের আশ্রয় চাই । এই সূরায় আল্লাহর তিনটি গুণ পরপর এসেছে, রব (প্রতিপালক), মালিক (অধিপতি) ও ইলাহ (মাবুদ) । ‘রব’ সেই সত্তা যিনি মাতৃগর্ভ থেকেই মানুষের লালন-পালন করেন, ধীরে ধীরে তাকে পূর্ণতায় পৌঁছে দেন; এই প্রতিপালন কেবল কিছু মানুষের নয়, সমগ্র মানবজাতির, বরং সমস্ত সৃষ্টিরই । এখানে বিশেষভাবে ‘মানুষ’ উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মর্যাদা বোঝাতে, আর যেহেতু আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে সেই কুমন্ত্রণাদাতা থেকে যে মানুষের অন্তরেই ফিসফিস করে ।
তিন আয়াতে ‘নাস’ (মানুষ) শব্দটি বারবার এসেছে, রব্বিন নাস, মালিকিন নাস, ইলাহিন নাস; এই পুনরাবৃত্তি একদিকে জোর দেয়, অন্যদিকে মানুষের প্রতি বিশেষ মমত্ব ও মনোযোগ ফুটিয়ে তোলে । সমস্ত সৃষ্টির রব হয়েও বিশেষভাবে ‘মানুষের রব’ বলা হয়েছে তাদের সম্মান দিতে এবং অন্তরের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয়ের প্রসঙ্গের সঙ্গে মিল রেখে ।
এটি সূরার প্রথম আয়াত, তাই পূর্বে কিছু নেই; তবে এটি পরের দুই আয়াতের ভিত্তি গড়ে দেয়, ‘মালিকিন নাস’ ও ‘ইলাহিন নাস’ । আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এমন এক সত্তার কাছে যিনি একইসঙ্গে মানুষের প্রতিপালক, অধিপতি ও মাবুদ; রব থেকে মালিক, মালিক থেকে ইলাহ, এই ক্রমে যেন আশ্রয়দাতার পরিচয় ধাপে ধাপে পূর্ণতা পায় ।
বিপদ যখন বাইরের, আমরা শক্তিশালী কারও আশ্রয় খুঁজি; কিন্তু এই সূরার বিপদ ভেতরের, অন্তরে ফিসফিস করা কুমন্ত্রণা। তাই আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এমন এক সত্তার কাছে, যিনি মানুষকে সবচেয়ে ভালো চেনেন, কারণ তিনিই মাতৃগর্ভ থেকে তাকে গড়েছেন ও লালন করেছেন, ‘মানুষের রব’ [২][৪]। এখানে ‘মানুষ’ শব্দ বারবার আসায় ফুটে ওঠে এক বিশেষ মমতা, যেন রব তাঁর প্রিয় সৃষ্টিকেই অন্তরের শত্রু থেকে আগলে রাখছেন [২][৫]। আর এই ‘রব’ পরিচয়ই পরের ‘মালিক’ ও ‘ইলাহ’-এর দিকে এগিয়ে নেয়, যেন বলা হচ্ছে, যিনি তোমাকে গড়েছেন, তিনিই তোমার মালিক, তিনিই তোমার একমাত্র মাবুদ, তাঁর কাছেই আশ্রয় নাও।
একটি শিশু ভয় পেলে ছুটে যায় মায়ের কোলে, কারণ মা-ই তাকে সবচেয়ে ভালো বোঝেন ও আগলে রাখেন। অন্তরের কুমন্ত্রণার ভয়ে বান্দাও তেমনি ছুটে যায় ‘মানুষের রবের’ কাছে, যিনি গর্ভ থেকেই তাকে গড়েছেন ও লালন করেছেন । যিনি তৈরি করেছেন, তিনিই তো সবচেয়ে ভালো জানেন কোথায় দুর্বলতা, কীভাবে রক্ষা করতে হয়; তাই অন্তরের অদৃশ্য শত্রু থেকে তাঁর আশ্রয়ই সবচেয়ে নিরাপদ ।
‘রব’ সেই সত্তা যিনি শুরু থেকে, মানুষ যখন মাতৃগর্ভে, তখন থেকেই তার দেখভাল ও লালন-পালন করেন, যতক্ষণ না সে সাবালক ও জ্ঞানসম্পন্ন হয় । এই প্রতিপালন কেবল কিছু মানুষের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির, বরং সমস্ত সৃষ্টির জন্য ব্যাপক । জালালাইনে এসেছে, তিনি মানুষের স্রষ্টা ও মালিক । অর্থাৎ আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এমন একজনের কাছে, যাঁর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর ও আদি।
যদিও আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টির রব, এখানে বিশেষভাবে ‘মানুষের রব’ বলা হয়েছে মানুষের মান ও মর্যাদা বোঝাতে । আরও একটি কারণ, এই সূরায় আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে সেই কুমন্ত্রণাদাতা থেকে যে মানুষেরই অন্তরে ফিসফিস করে; তাই যাদের রক্ষা করা উদ্দেশ্য, তাদের রবের পরিচয় দিয়েই শুরু করা হয়েছে, যা প্রসঙ্গের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায় ।
পরপর তিন আয়াতে আল্লাহর তিনটি গুণ এসেছে, ‘রব’ (প্রতিপালক), ‘মালিক’ (অধিপতি) ও ‘ইলাহ’ (মাবুদ) । ইবনে কাসীর বলেন, সবকিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তাঁর মালিকানাধীন, আর সবাই তাঁরই আনুগত্য করে । এই তিন গুণ মিলিয়ে বোঝানো হয়, যাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে তিনি একইসঙ্গে স্রষ্টা, সর্বময় কর্তা ও একমাত্র উপাস্য, তাই তিনিই প্রকৃত আশ্রয়দাতা।
কারণ ভেতরের শত্রু বাইরের শত্রুর চেয়ে কঠিন; তাকে দেখা যায় না, ধরা যায় না। এমন গোপন বিপদ থেকে সেই-ই রক্ষা করতে পারেন, যিনি অন্তরের গভীর পর্যন্ত জানেন, আর সেই জানা সবচেয়ে বেশি মানুষের স্রষ্টা ও প্রতিপালকেরই । তাই ‘রব্বিন নাস’ দিয়ে শুরু করে বোঝানো হয়, যিনি তোমাকে গড়েছেন ও লালন করেছেন, অন্তরের ফিসফিস থেকেও তিনিই তোমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
আশ্রয়দাতার দ্বিতীয় পরিচয়, ‘মালিকিন নাস’, মানুষের অধিপতি বা প্রকৃত বাদশাহ । যিনি সমগ্র মানুষের প্রতিপালন করেন, তিনিই তাদের সবকিছুর মালিক, অধিপতি ও রাজা হওয়ার একমাত্র উপযুক্ত । মুখতাসারে এসেছে, তিনিই মানুষের অধিপতি, যিনি তাদের ব্যাপারে যথেচ্ছ ফায়সালা করেন; তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো প্রকৃত অধিপতি নেই । ইবনে কাসীর বলেন, সবকিছু তাঁর মালিকানাধীন এবং সবাই তাঁরই আনুগত্যে আবদ্ধ ।
এখানেও ‘নাস’ (মানুষ) শব্দটি আবার এসেছে, যা আগের আয়াতের সঙ্গে এক ছন্দময় পুনরাবৃত্তি তৈরি করে এবং জোর ও মমত্ব দুটোই বাড়ায় । আর ‘রব’ থেকে ‘মালিক’-এ উত্তরণে অর্থে এক আরোহণ ঘটে, লালনকর্তা থেকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী ।
আগের আয়াতে ছিল ‘রব্বিন নাস’ (মানুষের প্রতিপালক), এ আয়াতে ‘মালিকিন নাস’ (মানুষের অধিপতি); প্রতিপালনের পর আসে সর্বময় কর্তৃত্বের ঘোষণা । আর পরের আয়াতে আসবে ‘ইলাহিন নাস’ (মানুষের মাবুদ); রব থেকে মালিক, মালিক থেকে ইলাহ, এই ধাপে ধাপে আশ্রয়দাতার পরিচয় তার চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে যায়, যিনি একমাত্র উপাসনা ও আশ্রয়ের যোগ্য ।
যিনি গর্ভ থেকে তোমাকে গড়ে তুলেছেন (রব), তিনিই আবার তোমার সবকিছুর প্রকৃত মালিক ও অধিপতি (মালিক), যাঁর সিদ্ধান্তের ওপর কারও হাত নেই [২][৩]। দুনিয়ার রাজা-বাদশাহরা ক্ষণিকের কর্তৃত্ব পায়, কিন্তু মানুষের প্রকৃত অধিপতি একমাত্র তিনিই, তিনি ছাড়া কেউ তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না [৩]। প্রতিপালনের কোমলতার পর এই কর্তৃত্বের ঘোষণা যেন বলে, যাঁর কাছে আশ্রয় নিচ্ছ, তিনি কেবল স্নেহশীল লালনকর্তা নন, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীও; আর পরের আয়াতে তিনিই হবেন ‘ইলাহ’, একমাত্র মাবুদ, যেখানে আশ্রয়দাতার পরিচয় পূর্ণতা পায়।
কোনো রাজ্যে বিপদে পড়লে মানুষ রাজার কাছে বিচার চায়, কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁরই হাতে। আয়াতটি বলে, মানুষের প্রকৃত বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ, যাঁর ফায়সালার ওপর কারও খবরদারি নেই । দুনিয়ার ক্ষমতাবানরা আসে-যায়, কিন্তু সব মানুষের ভাগ্যের আসল নিয়ন্ত্রক তিনিই; তাই অন্তরের শত্রু থেকেও আশ্রয় তাঁরই কাছে, কারণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ তাঁরই হাতে ।
‘রব’ লালন-পালন ও ধীরে ধীরে পূর্ণতায় পৌঁছানোর কোমল অর্থ বহন করে, আর ‘মালিক’ বোঝায় সর্বময় কর্তৃত্ব ও মালিকানা, যিনি যথেচ্ছ ফায়সালার অধিকারী । একটিতে আছে স্নেহ, অন্যটিতে কর্তৃত্ব; দুটি মিলে আশ্রয়দাতার পূর্ণ ছবি ফুটে ওঠে । যিনি ভালোবেসে গড়েছেন, ক্ষমতাও সম্পূর্ণ তাঁরই, তাই আশ্রয়ের জন্য তিনিই যথার্থ।
দুনিয়ার শাসকেরা ক্ষণস্থায়ী ও সীমিত কর্তৃত্ব পায়, যা একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের প্রকৃত অধিপতি একমাত্র আল্লাহ; তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো আসল মালিক নেই, আর তাঁর ফায়সালার ওপর কারও হস্তক্ষেপ চলে না । সবকিছু তাঁর মালিকানাধীন এবং সবাই তাঁরই আনুগত্যে আবদ্ধ । তাই প্রকৃত নিরাপত্তা কেবল এই চিরন্তন অধিপতির কাছেই।
এই ক্রম এক আরোহণ, লালনকর্তা থেকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী, আর পরের আয়াতে মাবুদ পর্যন্ত । প্রথমে রব বলে অন্তরে জাগে নির্ভরতা ও ভালোবাসা, এরপর মালিক বলে জাগে সম্মান ও কর্তৃত্বের স্বীকৃতি, আর শেষে ইলাহ বলে আসে একনিষ্ঠ উপাসনা । ধাপে ধাপে এই পরিচয় বুঝিয়ে দেয়, আশ্রয় ও ইবাদত উভয়ের যোগ্য একমাত্র তিনিই।
রব্বিন নাস, মালিকিন নাস, ইলাহিন নাস, পরপর তিনবার ‘নাস’ শব্দের পুনরাবৃত্তি একদিকে অর্থে জোর দেয়, অন্যদিকে মানুষের প্রতি বিশেষ মমত্ব ও মনোযোগ ফুটিয়ে তোলে । যেহেতু আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়া শত্রু থেকে, বারবার ‘মানুষ’ বলে যেন আশ্বস্ত করা হয়, এই মানুষেরই রব, মালিক ও মাবুদ তাকে আগলে রাখছেন ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
এই আয়াতে আশ্রয় চাওয়ার তৃতীয় বিশেষণ এসেছে-‘ইলাহিন নাস’ (اله الناس), অর্থাৎ মানুষের একমাত্র মা’বুদ বা উপাস্য । সংক্ষিপ্ত তাফসীর স্পষ্ট করে দেয়, তিনিই মানুষের প্রকৃত মা’বুদ, তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো সত্য মা’বুদ নেই । ইবন কাসীর দেখান, এই ছোট্ট সূরায় আল্লাহর তিনটি গুণ পরপর সাজানো হয়েছে-রব বা পালনকর্তা, মালিক বা অধিপতি, এবং ইলাহ বা মা’বুদ। সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তাঁর মালিকানাধীন, আর সবাই তাঁরই আনুগত্যাধীন । আবু বকর যাকারিয়াও এই তিন গুণকে এক সঙ্গে গেঁথে বলেন-আল্লাহ্ একাধারে রব, মালিক ও মা’বুদ; সব কিছুই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর মালিকানাধীন, তাঁর বান্দা, তাই এই তিন গুণে গুণান্বিত মহান সত্তার কাছেই আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । আহসানুল বায়ান এ একটি সূক্ষ্ম ক্রম দেখান-যিনি সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা এবং যাঁর হাতে গোটা দুনিয়ার বাদশাহী, একমাত্র তিনিই সর্বপ্রকার ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, একক মা’বুদ । যামাখশারী ও বিকাঈ যোগ করেন, ‘ইলাহ’ শব্দটি একান্তভাবে আল্লাহরই, এতে কারও অংশীদারিত্ব নেই; তাই বর্ণনার চূড়ান্ত স্তর হিসেবে একে শেষে রাখা হয়েছে ।
এ আয়াতের ভাষাশৈলী কয়েকটি দিক থেকে অসাধারণ। প্রথমত, ‘রব’, ‘মালিক’ ও ‘ইলাহ’-এই তিনটি বিশেষণ বদল, সিফাত বা ‘আতফে বায়ান হিসেবে পরপর সাজানো, যেখানে ‘ইলাহ’ সর্বশেষে এসে বর্ণনার চূড়ান্ত পরিণতি (গায়াতুল বায়ান) হয়েছে । দ্বিতীয়ত, প্রতিবার ‘নাস’ (الناس) শব্দটি গোপন সর্বনামে না ফিরে প্রকাশ্যভাবে পুনরাবৃত্ত হয়েছে-‘ইলাহুহুম’ না বলে ‘ইলাহিন নাস’ বলা হয়েছে; কারণ ‘আতফে বায়ান বর্ণনার স্পষ্টতার জন্যই, তাই এখানে ইযমার নয় ইযহারই উপযুক্ত । বিকাঈ দেখান, এই পুনরাবৃত্তি মানুষের তীব্র মুখাপেক্ষিতা ফুটিয়ে তোলে এবং বোঝায় প্রতিটি দিক থেকেই আল্লাহ্ তাদের পরিচালক । তৃতীয়ত, ‘ওয়াও’ দিয়ে যুক্ত না করে বিশেষণগুলো পাশাপাশি বসানো হয়েছে, যাতে মনে না হয় এরা ভিন্ন ভিন্ন সত্তা-আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে এক সত্তার সমষ্টিগত গুণাবলির কাছে ।
এই তিনটি আয়াত একটি আরোহী সিঁড়ির মতো-‘রবিন নাস’ (পালনকর্তা), তারপর ‘মালিকিন নাস’ (অধিপতি), শেষে ‘ইলাহিন নাস’ (মা’বুদ) । বিকাঈ এই ক্রমের রহস্য খুলে বলেন: রুবুবিয়্যাত আগে এসেছে তার ব্যাপকতার জন্য, কারণ প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুই সমানভাবে প্রতিপালিত; মাঝে এসেছে মালিকিয়্যাত, কারণ মালিকই আদেশ-নিষেধের অধিকারী এবং তাঁর মালিকানা তাঁর সৃষ্টিরই অনুসরণ; আর ইলাহিয়্যাত শেষে এসেছে তার বিশেষত্বের জন্য । তিনি দেখান, রুবুবিয়্যাত মালিকিয়্যাতকে অপরিহার্য করে, আর মালিকিয়্যাত ইলাহিয়্যাতকে-এক গুণ থেকে আরেক গুণ অনিবার্যভাবে বেরিয়ে আসে । যিনি পালক ও অধিপতি, তিনি ছাড়া আর কারও মা’বুদ হওয়ার অধিকার নেই, কারও কাছে আশ্রয় চাওয়াও সাজে না । আর এই তিন গুণের সমন্বয়েই পরের আয়াতে আসা শত্রু-কুমন্ত্রণাদাতা, আত্মগোপনকারী ওয়াসওয়াসা-র অনিষ্ট থেকে পূর্ণ আশ্রয় নিশ্চিত হয় ।
duplicate
ভাবুন, কেউ ভয়ংকর বিপদে পড়ে প্রথমে ছুটে যায় তার পালক বা অভিভাবকের কাছে, তারপর আশ্রয় খোঁজে এমন কারও কাছে যিনি সবকিছুর মালিক ও পরিচালক-সবশেষে সে অন্তর থেকে ভালোবেসে নতজানু হয় তারই সামনে, যাঁকে সে প্রকৃত প্রভু বলে মানে । ‘ইলাহ’ মানে ঠিক এই শেষ স্তরের সত্তা-যাঁকে মানুষ ভালোবাসে, যাঁর কাছেই সব প্রয়োজনে আশ্রয় নেয়, যাঁর ইবাদত করে । আয়াতটি বলছে, মানুষের সেই একমাত্র সত্য মা’বুদ আল্লাহ্, তিনি ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় ।
ইবন কাসীর বলেন, এই সূরায় আল্লাহর তিনটি গুণ একসঙ্গে এসেছে-তিনি পালনকর্তা, শাহানশাহ ও মা’বুদ; সব কিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন, সবই তাঁর মালিকানাধীন, সবাই তাঁর আনুগত্যাধীন । আবু বকর যাকারিয়া যোগ করেন, এই তিন গুণে গুণান্বিত মহান সত্তার কাছেই আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ সব কিছুই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর মালিকানাধীন, তাঁর বান্দা । বিকাঈ দেখান, তিনটি গুণ পরস্পরকে অনিবার্য করে-রুবুবিয়্যাত মালিকিয়্যাতকে টেনে আনে, আর মালিকিয়্যাত ইলাহিয়্যাতকে; ফলে আশ্রয়প্রার্থীর সামনে আল্লাহর পূর্ণ পরিচয় ফুটে ওঠে ।
যামাখশারী ও বিকাঈ এর কারণ খোলাসা করেন: ‘রব’ বা ‘মালিক’ শব্দটি কখনো রূপকার্থে মানুষের ক্ষেত্রেও বলা চলে, কিন্তু ‘ইলাহ’ একান্তভাবে আল্লাহরই-এতে কারও অংশীদারিত্বের অবকাশ নেই । তাই বর্ণনাকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন স্তরে পৌঁছে দিতে একে সর্বশেষে ‘গায়াতুল বায়ান’ অর্থাৎ বর্ণনার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে রাখা হয়েছে । বিকাঈ আরও বলেন, ইলাহিয়্যাত শেষে এসেছে তার বিশেষত্বের কারণে, কারণ যে ব্যক্তি তাঁর আদেশ-নিষেধ মানে না সে নিজেই নিজেকে তাঁকে মা’বুদ বানানোর বাইরে নিয়ে যায়-যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই ।
এ এক চমৎকার অলংকারিক প্রশ্ন, যা যামাখশারী নিজেই তোলেন। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আতফে বায়ান’ বা ব্যাখ্যামূলক সংযোজনের কাজই হলো স্পষ্ট করা, তাই এখানে গোপন সর্বনামের (ইযমার) বদলে প্রকাশ্য নামের (ইযহার) পুনরাবৃত্তিই উপযুক্ত । বিকাঈ আরও গভীরে গিয়ে দেখান, ‘ইলাহুহুম’ না বলে বারবার ‘নাস’ উচ্চারণ করায় মানুষের তীব্র মুখাপেক্ষিতা ও অস্থিরতা ফুটে ওঠে, আর বোঝা যায় আল্লাহ্ প্রতিটি দিক থেকেই তাদের পরিচালক । এই পুনরাবৃত্তি মানুষের মর্যাদা ও তার প্রতি বিশেষ যত্নকেও তুলে ধরে ।
যামাখশারী বলেন, পুরো আশ্রয়-প্রার্থনাটিই হয়েছে সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের বুকে ফিসফিস করে; তাই মানুষ আশ্রয় নেয় তাদের সেই রবের কাছে যিনি তাদের সব ব্যাপারের মালিক, যিনি তাদের ইলাহ ও মা’বুদ । ইবন কাসীর দেখান, এই গোপন শত্রু মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করলে পিছিয়ে যায়, আর ভুলে গেলেই ফিরে এসে অন্তরে থাবা বসায়-এটাই ‘ওয়াসওয়াসাতুল খান্নাস’ । অর্থাৎ আগে আল্লাহর পূর্ণ পরিচয় (রব-মালিক-ইলাহ) দৃঢ় করে নেওয়া হলো, যাতে এই শত্রুর বিরুদ্ধে আশ্রয় হয় সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ ।
আহসানুল বায়ান বলেন, যিনি সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা এবং যাঁর হাতে গোটা দুনিয়ার বাদশাহী, একমাত্র তিনিই সব ইবাদত পাওয়ার যোগ্য একক মা’বুদ-তাই বান্দা বলে, ‘আমি সেই সুমহান সত্তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’ । বিকাঈ দেখান, এই তিন গুণে আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের অর্থ নিহিত এবং ঈমানের সব মূলনীতি গাঁথা আছে; ‘ইলাহ’ শব্দটিই সব কামাল ও জালালের গুণের সমাহার, তাই এতে সব আসমাউল হুসনা ঢুকে পড়ে । এমন পূর্ণতার অধিকারীর কাছেই আশ্রয় চাওয়া বান্দার জন্য সবচেয়ে যথার্থ, কারণ এই ত্রিগুণের ক্রমই তাঁর একত্ববাদের সবচেয়ে নিখুঁত প্রমাণ ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
এই আয়াতে আশ্রয় চাওয়ার আসল কারণটি উন্মোচিত হলো-যার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে রব, মালিক ও মা'বুদের কাছে শরণ নেওয়া হলো, সে হলো ওয়াসওয়াসুল খান্নাস। ওয়াসওয়াস (الوَسواس) শব্দটি কিছু আলিমের মতে ইসম ফায়িল মুওয়াসবিস (مُوَسوِس), অর্থাৎ কুমন্ত্রণাদাতার অর্থে; আবার কারো মতে এর মূল ‘যিল-ওয়াসওয়াস’ (ذو الوسواس)-কুমন্ত্রণার অধিকারী । ওয়াসওয়াসা মানে গোপন, চাপা স্বর; অলংকারের ঝংকার বা মনের ফিসফিসানির মতো শয়তান যে অলক্ষ্য পথে অন্তরে নানা প্রলোভন ফেলে । তাকে তার কর্ম দিয়েই নাম দেওয়া হয়েছে-যেমন বিচারককে ‘আদল’ বলা হয়-কারণ এই কুমন্ত্রণাই তার আজীবনের পেশা । খান্নাস (الخَنّاس) মানে সরে-পড়া, পিছিয়ে-যাওয়া যার স্বভাব । তার রহস্য একটিই: আল্লাহর যিকর হলেই সে গুটিয়ে যায়, পিছু হটে; আর মানুষ গাফিল হলেই ফিরে এসে অন্তরে ছেয়ে যায় । হাদীসে এসেছে, প্রত্যেকের সঙ্গে একজন শয়তান নিযুক্ত আছে । ইবন আব্বাসের বর্ণনায়, সে আদম-সন্তানের অন্তরে থাবা গেড়ে রাখে-মানুষ গাফিল হলে কুমন্ত্রণা দেয়, আল্লাহকে স্মরণ করলে পিছিয়ে যায় । তাই এই শত্রু থেকে রক্ষার একমাত্র অস্ত্র যিকর-আল্লাহর স্মরণই শয়তানকে তাড়ায় ও অন্তরকে আলোকিত করে ।
ওয়াসওয়াস (الوَسواس) শব্দটি গঠনে অর্থানুকারী-‘ওয়াস-ওয়াস’ দ্বিরুক্ত অক্ষরে চাপা, পুনরাবৃত্ত ফিসফিসানিরই ধ্বনি, যেমন যিলযাল মানে ঝাঁকুনি; দ্বিরুক্ত শব্দ দ্বিরুক্ত অর্থ বহন করে, কারণ কুমন্ত্রণাদাতা গোপনে বারবার একই কথা অন্তরে ছুঁড়ে দেয় । শয়তানকে তার কর্ম দিয়েই নাম দেওয়া-ওয়াসওয়াস ও খান্নাস-অতিশয়োক্তির ভঙ্গি, যেন কুমন্ত্রণাই তার সত্তা । খান্নাস (الخَنّاس)-এও মুবালাগার গঠন: সরে-পড়া তার স্থায়ী অভ্যাস । যামাখশারীর মতে الَّذِي يُوَسوِس-এ তিন প্রকার ই'রাব সম্ভব-জার্ বিশেষণ হিসেবে, আর রফ্ ও নসব শয়তানকে গালি-নিন্দা অর্থে; পাঠক ‘খান্নাস’-এ থেমে ‘আল্লাযী’ থেকে শুরু করতে পারেন ।
পূর্ববর্তী তিন আয়াতে আল্লাহর তিন গুণ-রব (رب), মালিক (مَلِك) ও ইলাহ (إله)-ক্রমে উচ্চারিত হয়ে আশ্রয় প্রার্থনা পূর্ণ হলো; এরপরই এই আয়াতে বলা হলো কার অনিষ্ট থেকে আশ্রয়-‘মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস’ । আল-বিকাঈ দেখান, ইহসান, মহত্ত্ব বা কর্তৃত্বের সব দিক থেকে আশ্রয় পূর্ণ করার পরই মুস্তা'আয মিনহু-যার থেকে আশ্রয়-কে আনা হলো । যামাখশারীর সূক্ষ্ম মুনাসাবা: রব, মালিক ও ইলাহ বিশেষভাবে ‘নাস’ (মানুষ)-এর দিকে সম্বন্ধিত করা হয়েছে, কারণ আশ্রয়টাই তো মানুষের বুকে কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে; তাই যিনি মানুষের যাবতীয় বিষয়ের মালিক, সেই রবের কাছেই শরণ । আর পরের আয়াত ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু ফী সুদূরিন নাস’ এই খান্নাসেরই কাজকে খুলে বলে-সে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা ঢালে ।
কল্পনা করুন এমন এক শত্রুকে, যে কখনো সামনে এসে লড়ে না। সে আসে নিঃশব্দে, বুকের ভিতরে চাপা গলায় ফিসফিস করে-এই কাজটা করেই ফেলো, একটু তো দোষ নেই-আর তারপর গা ঢাকা দেয়। এ-ই হলো ওয়াসওয়াসুল খান্নাস। ওয়াসওয়াস (الوَسواس) মানে সেই গোপন কুমন্ত্রণা, যা অলংকারের চাপা ঝংকারের মতো অলক্ষ্যে অন্তরে এসে পড়ে [২][৬]; আর খান্নাস (الخَنّاس) মানে সরে-পড়া, পিছিয়ে-যাওয়া যার চিরস্বভাব [১][২]। এই দুই নামই আসলে শয়তানের কর্মের নাম-কুমন্ত্রণাই তার পেশা, পিছিয়ে যাওয়াই তার কৌশল [৬][৭]। তার একটিমাত্র দুর্বলতা ধরিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ: মানুষ যখন তাঁকে স্মরণ করে, তখন সে গুটিয়ে পিছিয়ে যায়; আর মানুষ যেই গাফিল হয়, সে ফিরে এসে অন্তর জুড়ে বসে [২][৩][৪]। ইবন আব্বাসের কথায়, সে আদম-সন্তানের অন্তরে থাবা গেড়ে রাখে; ভুল ও উদাসীনতার ফাঁকেই কুমন্ত্রণা ঢালে, আর যিকরের সামনে কেটে পড়ে [৪]। তাই আগের আয়াতগুলোয় রব, মালিক ও ইলাহ-মানুষের প্রতিপালক, অধিপতি ও মা'বুদ-কে ডেকে আশ্রয় চাওয়ার পর এখানে বলা হলো ঠিক কার থেকে সেই আশ্রয় [৬][৭]। আর পরের আয়াত এই খান্নাসের কাজটাই খুলে দেখাবে-সে মানুষের বুকে কুমন্ত্রণা ঢালে [৪][৬]। সব মিলিয়ে শিক্ষা একটাই: এই লুকোনো শত্রুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র আল্লাহর স্মরণ, কারণ যিকরই শয়তানকে তাড়ায় ও অন্তরকে আলোকিত করে [৭]।
ভাবুন, ঘরে কেউ গোপনে ঢুকে কানে কুপরামর্শ দিয়ে, পায়ের শব্দ না তুলে সরে পড়ছে; আপনি বাতি জ্বালালেই সে গা ঢাকা দেয়, অন্ধকার হলেই আবার ফেরে। শয়তানও তেমন: গোপন ফিসফিসানিতে অন্তরে কুমন্ত্রণা ঢালে , আর আল্লাহর যিকরের ‘আলো’ পেলেই সরে যায়, গাফিলতির অন্ধকারে আবার ফিরে আসে । অলংকারের চাপা ঝংকারের মতো তার স্বরও অলক্ষ্য । ইবন আব্বাসের বর্ণনায় সে অন্তরে থাবা গেড়ে রাখে, ভুলের ফাঁকে কুমন্ত্রণা দেয়, আর স্মরণের সামনে কেটে পড়ে ।
খান্নাস (الخَنّاس) এসেছে ‘খুনূস’ থেকে, যার অর্থ পিছিয়ে যাওয়া, সরে পড়া, গা ঢাকা দেওয়া । শব্দের গড়নটাই মুবালাগার-অর্থাৎ যার অভ্যাসই হলো বারবার সরে যাওয়া । নামকরণের কারণ তার আচরণে: আল্লাহর যিকর হলেই সে গুটিয়ে পিছিয়ে যায়, আর মানুষ স্মরণ থেকে উদাসীন হলেই ফিরে এসে অন্তরে ছেয়ে যায় । বিকাঈ বলেন, যিকর তার কাছে যেন হাতুড়ির মতো যা তাকে দমন করে, তাই সে যিকর থেকে ভীষণ পালায়-এ কারণেই মুমিনের শয়তান থাকে দুর্বল, রোগা ।
কিছু আলিমের মতে ওয়াসওয়াস (الوَسواس) এখানে ইসম ফায়িল-অর্থাৎ মুওয়াসবিস (مُوَسوِس), কুমন্ত্রণাদাতা; আবার কারো মতে এর মূল ‘যিল-ওয়াসওয়াস’ (ذو الوسواس), কুমন্ত্রণার অধিকারী । যামাখশারী ও বিকাঈ ব্যাখ্যা করেন, ওয়াসওয়াস মূলত একটি নাম যার অর্থ ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা)-যেমন ‘যিলযাল’ মানে ঝাঁকুনি; এখানে শয়তানকে তার কর্ম দিয়েই নাম দেওয়া হয়েছে, কারণ কুমন্ত্রণা ঢালাই তার আজীবনের পেশা ও স্বভাব । মাসদার বা ক্রিয়ামূল হিসেবে অবশ্য ‘ওয়িসওয়াস’ (কাসরাযুক্ত) পড়া হয়, যেমন ‘যিলযাল’ ।
সূত্রগুলোর কেন্দ্রীয় উত্তর একটাই-আল্লাহর যিকর বা স্মরণ। বিকাঈ বলেন, রাজাধিরাজ আল্লাহ এমন কোনো রোগ নামাননি যার ওষুধ নামাননি; আর কুমন্ত্রণার ওষুধ বানিয়েছেন তাঁর স্মরণকে, কারণ যিকর শয়তানকে তাড়ায়, অন্তরকে আলোকিত ও নির্মল করে । আহসানুল বায়ান ও মুখতাসারও বলে, কোনো স্থানে আল্লাহর যিকর হলে শয়তান সরে পড়ে, আর মানুষ গাফিল হলে অন্তরে ছেয়ে যায় । ইবন কাসীরের বর্ণনায়, মানুষ আল্লাহর ইবাদত করলে সে অন্তর থেকে হাত সরিয়ে নেয়, আর ভুলে গেলে অন্তরের উপর পূর্ণ আধিপত্য পায় ।
হাদীসে এসেছে, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই একজন শয়তান নিযুক্ত করা হয়েছে; সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন-‘আপনার সঙ্গেও?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে আমি নিরাপদ এবং সে কেবল ভালো কাজের কথাই বলে’ । এ থেকে বোঝা যায়, সঙ্গী-শয়তান থাকা মানেই পরাজয় নয়; আল্লাহর সাহায্য ও স্মরণে সে নিয়ন্ত্রিত হয়, এমনকি কল্যাণের দিকেই পরিণত হতে পারে। তাই এই শত্রুর উপস্থিতিতে ভয় নয়, বরং রবের আশ্রয়ই মুমিনের ভরসা ।
বিকাঈ বিস্তারিত বলেন-শয়তান গোপনে গুনাহকে সাজিয়ে, প্রবৃত্তি উসকে মানুষকে পাপে ফেলে, এরপর তা ফাঁস করে আরো বেহায়া করে তোলে । সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো অহংকার ও আত্মতুষ্টি-এই দুটিই ইবলিসকে ধ্বংস করেছিল; এ থেকে জন্মে হিংসা, বিদ্বেষ, সত্য প্রত্যাখ্যান, কুফর, ফিসক ও অবাধ্যতা, মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান-যেমন শয়তানের ‘আমি তার চেয়ে উত্তম’ । আদম আলাইহিস সালামের ঘটনায় কসম খেয়ে ধোঁকা, মিথ্যা ও সম্পর্ক নষ্টের নমুনাও সে দেখায় । মূলে সে আকীদা, আখলাক, আমল-সবকিছু নষ্ট করতে চায়, কিন্তু সদিচ্ছার মানুষ চিকিৎসায় সারে ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
সূরা আন-নাসের পঞ্চম আয়াত আগের আয়াতে উল্লেখিত সেই কুমন্ত্রণাকারীর পরিচয় স্পষ্ট করছে-আল্লাযী ইউওয়াসবিসু ফী সুদূরিন নাস (الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ), যে মানুষের বুকের ভেতরে গোপনে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয় । মুফাসসিরগণের সম্মিলিত ব্যাখ্যায় ‘ওয়াসওয়াসা’ (وَسْوَسَة) মানে এমন এক চাপা, অস্ফুট ফিসফিসানি, যা ক্ষতিকর অর্থগুলোকে গোপনে ও বারবার আবৃত্তি করে অন্তরে পৌঁছে দেয়-কোনো শব্দ শোনা ছাড়াই তার মর্ম পৌঁছে যায় । তাফসীরে জালালাইন এই আয়াতে ‘সুদূর’-কে ‘কুলূব’ অর্থাৎ অন্তর বলে ব্যাখ্যা করে শর্ত যোগ করেছেন-এই কুমন্ত্রণা তখনই কার্যকর হয় যখন মানুষ আল্লাহর যিকর থেকে গাফেল হয়ে পড়ে । ইবনে কাসীর এই সত্যকেই বিস্তৃত করেছেন: শয়তান আদম-সন্তানের অন্তরে যেন থাবা বসিয়ে রাখে; মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে তখন সে গুটিয়ে যায়, আর যখন সে আল্লাহকে ভুলে যায় তখন সে অন্তরের উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করে-এটিই ‘ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ । বিকাঈ লক্ষ করেছেন, ‘সুদূর’ (বুক) শব্দটি ব্যবহারের কারণ-বুক হলো অন্তরের আঙিনা ও আবাসস্থল, যার ভেতর দিয়ে বাইরের প্রভাবগুলো অন্তরে ঢোকে; শব্দটি কুমন্ত্রণার আধিক্যের প্রতি ইঙ্গিত দেয় । সব মিলিয়ে আয়াতটি দেখায়-শত্রুর আক্রমণস্থল মানুষের সবচেয়ে গোপন অভ্যন্তর, আর তার একমাত্র প্রতিষেধক আল্লাহর স্মরণ ও আশ্রয়প্রার্থনা।
এই আয়াতে ‘আন-নাস’ (النَّاس) শব্দের পুনরাবৃত্তি সমগ্র সূরার এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য; প্রথম তিন আয়াতে রব, মালিক ও ইলাহ-এই তিন গুণের সঙ্গেই ‘নাস’ যুক্ত হয়েছে আশ্রয়প্রার্থনার রীতি ও আবেগের পূর্ণতার জন্য, কেননা যে শত্রু থেকে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে সে মানুষের বুকেই কুমন্ত্রণা দেয় । ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু’ (الَّذِي يُوَسْوِسُ)-এই ‘আল্লাযী’ পদে তিনটি ই‘রাব সম্ভব: জার (বিশেষণরূপে খান্নাসের সঙ্গে), রফ‘ ও নসব (নিন্দাসূচক)-আর তাই পাঠকের জন্য ‘খান্নাস’-এ থেমে ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু’ থেকে আবার শুরু করা উত্তম । ‘সুদূর’ (বুক) শব্দটি ‘কুলূব’ (অন্তর)-এর বদলে আনা হয়েছে কুমন্ত্রণার আধিক্য ও তার প্রবেশপথ বোঝাতে । ‘ওয়াসওয়াসা’ শব্দটি নিজেই অনুকরণমূলক-চাপা, লুকানো স্বর, যেমন গয়নার মৃদু ঝঙ্কার ।
আয়াতটি আগের ও পরের আয়াতের মাঝখানে এক সেতুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আগের আয়াতে শত্রুকে নাম দেওয়া হয়েছিল গুণ দিয়ে-‘আল-ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ (الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ), সেই কুমন্ত্রণাকারী যে আত্মগোপন করে; বিকাঈ লক্ষ করেছেন, আগের আয়াতে যখন আশ্রয়প্রার্থিত শত্রুর গুণ বর্ণিত হলো, তখন এই আয়াতে এসে সেই গুণের কার্যকর প্রকাশকে-অর্থাৎ সে আসলে কী করে তা-তুলে ধরা হলো । ‘খান্নাস’ ও ‘ইউওয়াসবিসু’-এর সম্পর্কও স্পষ্ট: বান্দা যখন রবকে স্মরণ করে তখন সে গুটিয়ে যায় (খান্স), আর গাফলতের মুহূর্তে আবার কুমন্ত্রণা দেয় । আর পরের আয়াত ‘মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস’ (مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ) এই কুমন্ত্রণাকারীর বিবরণ (বায়ান) হিসেবে আসছে-দেখাচ্ছে এই শয়তান দুই রকম: জিন্ন ও মানুষ উভয়ের মধ্য থেকে ।
আগের আয়াতে আমরা শত্রুর নাম পেয়েছিলাম গুণের আড়ালে-সে এমন এক ফিসফিসানিদাতা, যে আঘাত হেনেই সরে পড়ে। এই আয়াত সেই আড়াল সরিয়ে দেখায় সে আসলে কী করে: মানুষের বুকের ভেতরে, একেবারে গোপন প্রকোষ্ঠে, ক্ষতিকর ভাবনাগুলো নিঃশব্দে আর বারবার ঢেলে দেয়-কোনো কণ্ঠস্বর কানে আসে না, অথচ অর্থটা ঠিক অন্তরে পৌঁছে যায় [৬][৭]। লক্ষণীয়, এখানে ‘অন্তর’ না বলে ‘বুক’ বলা হয়েছে; বিকাঈর ভাষায় বুক হলো অন্তরের আঙিনা, যার বারান্দা দিয়ে বাইরের সব প্রভাব ভেতরে ঢোকে-শব্দটি বুঝিয়ে দেয় কুমন্ত্রণা ঠিক কোন দরজা দিয়ে আসে এবং তা কত বিপুল [৭]। কিন্তু এই শত্রুর শক্তি নিরঙ্কুশ নয়। জালালাইন একটিমাত্র শর্তে গোটা চিত্রটা পাল্টে দেন-এই কুমন্ত্রণা কার্যকর হয় কেবল তখনই যখন মানুষ আল্লাহর যিকর থেকে উদাসীন হয় [৫]। ইবনে কাসীর সেই কথাকেই জীবন্ত করে তোলেন: শয়তান যেন অন্তরের উপর হাত রেখে বসে আছে; বান্দা আল্লাহকে স্মরণ করলে সে হাত গুটিয়ে পিছিয়ে যায় (এটিই তার ‘খান্স’), আর বান্দা ভুলে গেলে সে অন্তরে কর্তৃত্ব কায়েম করে-এর নামই ‘ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ [৪]। তাই পরের আয়াত যখন বলে এই শত্রু জিন্ন ও মানুষ-দুই জাতের মধ্যেই আছে [৬][৪], তখন গোটা ছবিটা সম্পূর্ণ হয়: লড়াইটা বাইরে নয়, একেবারে বুকের ভেতরে; আর সেই গোপন রণক্ষেত্রে মানুষের একমাত্র ঢাল রবের স্মরণ ও তাঁরই কাছে আশ্রয় চাওয়া।
ভাবুন, আপনি একা ঘরে শান্ত মনে বসে আছেন, হঠাৎ ভেতর থেকে কেউ যেন চুপিচুপি বলতে থাকে-‘থাক, আজ নামাজটা পরে পড়ো’, কিংবা ‘ওই কথাটা বলে দাও না’। কোনো গলা কানে আসে না, তবু ভাবনাটা ঠিক বুকে গেঁথে যায়। এটাই ‘ওয়াসওয়াসা’ (وَسْوَسَة)-চাপা, লুকানো এক ফিসফিসানি, যা ক্ষতিকর অর্থ নিঃশব্দে ও বারবার অন্তরে পৌঁছে দেয় । বিকাঈ বলেন, বুক হলো অন্তরের আঙিনা, যার বারান্দা দিয়েই এসব ভেতরে ঢোকে । আর ইবনে কাসীরের চিত্রটি স্মরণীয়-আপনি আল্লাহকে স্মরণ করলে সেই ফিসফিসানি পিছিয়ে যায়, ভুলে গেলে আবার ফিরে এসে চেপে বসে ।
বিকাঈ এর সূক্ষ্ম কারণটি ধরেছেন। ‘কালব’ (قَلْب) অর্থাৎ অন্তর হলো ভেতরের গূঢ় কেন্দ্র, আর ‘সাদ্র’ (صَدْر) বা বুক হলো সেই অন্তরের আঙিনা ও আবাসস্থল-অন্তরে ঢোকার দরজা ও বারান্দা যেন এই বুক। বাইরের যত প্রভাব, তা প্রথমে এই বুক দিয়েই প্রবেশ করে তারপর অন্তরে পৌঁছায় । তাই ‘বুকের ভেতরে কুমন্ত্রণা’ বলার অর্থ-শয়তান একেবারে প্রবেশপথেই হানা দেয়। বিকাঈ আরও বলেন, ‘সুদূর’ শব্দটি কুমন্ত্রণার আধিক্যের প্রতিও ইঙ্গিত করে । জালালাইন আবার সরাসরি ‘সুদূর’-কে ‘কুলূব’ অর্থাৎ অন্তর বলে ব্যাখ্যা করেছেন, কেননা শেষ লক্ষ্য তো অন্তরই ।
না, এটি সর্বক্ষণ সমান নয়-এর একটি স্পষ্ট শর্ত আছে। জালালাইন আয়াতের ব্যাখ্যায় যোগ করেছেন: এই কুমন্ত্রণা তখনই কার্যকর হয় ‘যখন তারা আল্লাহর যিকর থেকে গাফেল হয়’ । ইবনে কাসীর সাঈদ ইবনে জুবায়রের সূত্রে একই কথা টেনেছেন-মানুষ যখন রবকে স্মরণ করে শয়তান গুটিয়ে পিছিয়ে যায়, আর গাফেল হলেই কুমন্ত্রণা দেয় । তিনি আরও বর্ণনা করেন, শয়তান যেন অন্তরের উপর হাত রেখে বসে থাকে; ইবাদতের সময় হাত সরায়, আল্লাহকে ভুললে চেপে বসে-এটিই ‘ওয়াসওয়াসুল খান্নাস’ । তাই গাফলত তার দরজা, আর যিকর তার তালা।
দুটো আসলে একই শত্রুর দুই গতিভঙ্গি, যা পরস্পরের পরিপূরক। ‘খান্নাস’ (الْخَنَّاس) মানে যে গুটিয়ে যায়, পিছিয়ে আত্মগোপন করে; আর ‘ইউওয়াসবিসু’ (يُوَسْوِسُ) মানে যে গোপনে কুমন্ত্রণা ঢালে। জামাখশারী দেখান, এই দুই গুণ একসঙ্গে কাজ করে-বান্দা রবকে স্মরণ করলে সে ‘খান্স’ করে সরে যায়, আর গাফলতের মুহূর্তে আবার ‘ওয়াসওয়াসা’ নিয়ে ফিরে আসে । বিকাঈ এই ক্রমটিকে বলেন-আগের আয়াতে শত্রুর গুণ বর্ণিত হলো, আর এই আয়াতে সেই গুণের কার্যকর প্রকাশ, অর্থাৎ সে বাস্তবে কী করে, তা তুলে ধরা হলো ।
হ্যাঁ, জামাখশারী কয়েকটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রথমত, ‘আল্লাযী ইউওয়াসবিসু’ (الَّذِي يُوَسْوِسُ)-তে ‘আল্লাযী’ পদে তিন রকম ই‘রাব সম্ভব-জার (খান্নাসের বিশেষণরূপে), রফ‘ ও নসব (নিন্দাসূচক হিসেবে); আর তাই তিলাওয়াতে ‘খান্নাস’-এ থেমে এখান থেকে নতুন করে শুরু করা শ্রুতিমধুর । দ্বিতীয়ত, ‘ওয়াসওয়াস’ (وَسْوَاس) শব্দটি অনুকরণমূলক-চাপা, লুকানো স্বর বোঝায়, যেমন গয়নার মৃদু ঝঙ্কারকেও ‘ওয়াসওয়াস’ বলা হয় । আর সমগ্র সূরায় ‘নাস’ (النَّاس) শব্দের পুনরাবৃত্তি আশ্রয়প্রার্থনার আবেগকে পূর্ণতা দেয়, কেননা শত্রু এই মানুষেরই বুকে হানা দেয় ।
পরের আয়াত ‘মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস’ (مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ) এই কুমন্ত্রণাকারীর পরিচয়-বিবরণ (বায়ান) হিসেবে আসছে-দেখাচ্ছে শত্রু এক প্রকার নয়, দুই প্রকার: জিন্ন শয়তান ও মানুষ শয়তান । ইবনে কাসীর অন্য আয়াত টেনে এনে স্পষ্ট করেন-‘মানব ও দানব শয়তানরা’ একে অপরকে চমকপ্রদ কথা সাজিয়ে ধোঁকা দেয় (৬:১১২) । অর্থাৎ কুমন্ত্রণা কেবল অদৃশ্য জিন্নের কাজ নয়; কোনো মানুষও যখন আপনার কানে কুপরামর্শ সাজিয়ে দেয়, সেও এই ‘ওয়াসওয়াসা’র বাহক। জামাখশারী আবু যারের সেই উক্তিও স্মরণ করান-‘তুমি কি মানুষ-শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছ?’ ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
শেষ আয়াত মিনাল জিন্নাতি ওয়ান-নাস (مِنَ الجِنَّةِ والنّاسِ) আগের আয়াতের সেই কুমন্ত্রণাদাতাকে চিহ্নিত করে দেয়-সে দুই জাতের: জিন (الجِنَّة) থেকে আর মানুষ (النّاس) থেকে । মুফাসসিরগণ এখানে দুটি ব্যাখ্যা দেন। প্রথমত, এটি ওয়াসওয়াস (الوَسواس)-এর বিবরণ-অর্থাৎ কুমন্ত্রণাকারী শয়তান জিন্নি ও ইনসি দুই রকমই, যেমন কুরআনের অন্যত্র এসেছে শায়াতীনুল ইনসি ওয়াল-জিন্ন (شَياطِين الإنس والجِنّ) । দ্বিতীয়ত, এটি আগের আয়াতের 'নাস' শব্দটিরই বিবরণ-অর্থাৎ জিনও 'নাস' শব্দের অন্তর্ভুক্ত, যেমন সূরা জিনে তাদের জন্য রিজাল (رِجال) ও নাফার (نَفَر) ব্যবহৃত হয়েছে । ইবন কাসীর প্রথম মতকেই শক্তিশালী বলেছেন-কুমন্ত্রণাকারী জিন থেকেও হয়, মানুষ থেকেও । আবু বকর যাকারিয়া এর সঙ্গে যোগ করেন: শয়তান যেমন বাইরে থেকে মনে কথা ফেলে, তেমনি মানুষের নিজের নফসও কুমন্ত্রণা দেয়, তাই রাসূল (সা.) নিজ নফসের অনিষ্ট থেকেও আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন । আল-বিকাঈ মানুষ-শয়তানকে 'অধিক ক্ষতিকর' বলে আগে এনেছেন বলে মত দেন এবং এর প্রতিকার হিসেবে সঙ্গ-পরিত্যাগের কথা বলেন । এভাবে সূরাটি শেষ হয় ঠিক সেই বিন্দুতে-আশ্রয়প্রার্থনার-যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ।
আয়াতটি বয়ান (بَيان)-আগের আয়াতের অস্পষ্ট কুমন্ত্রণাকারীকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে: সে জিন্নি ও ইনসি । জালালাইন ও যামাখশারী দেখান যে 'মিন' (مِن)-কে দুইভাবে পড়া যায়-হয় ওয়াসওয়াসের বয়ান (এটি দুই জাতের), নয়তো 'ইউওয়াসউইসু'র সঙ্গে যুক্ত করে 'কুমন্ত্রণার উৎস' অর্থে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নাস (النّاس)-এর উপর আতফ হয় । যামাখশারী একটি সূক্ষ্ম আপত্তি ও সমাধানও তুলে ধরেন-'মানুষ তো মনে কুমন্ত্রণা দেয় না'-যার জবাব: মানুষ বাইরে থেকে এমন কথা বলে যা পরে হৃদয়ে গিয়ে গাঁথে । আল-বিকাঈ লক্ষ করেন আহাম্ম ও আদার্র (الأهَمّ الأضَرّ)-অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক ক্ষতিকরকে আগে আনার অলংকার । সর্বোপরি সূরার মাকতা' (শেষ) আবার ফিরে আসে মাতলা'য় (শুরুতে), আর সমাপ্তি মিলে যায় ফাতিহার সূচনার সঙ্গে-খুতিমাতিস সূরাতু বিমা বুদিয়াত বিহি (خُتِمَت السُّورَة بِما بُدِئَت بِهِ) ।
আগের আয়াতে বলা হয়েছিল আল্লাযী ইউওয়াসউইসু ফী সুদূরিন-নাস-যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়; কিন্তু সেই 'যে'-টি কে, তা ছিল অনুক্ত। এই শেষ আয়াত সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়: সে জিন থেকেও আসে, মানুষ থেকেও । আল-বিকাঈ এটিকে আগের আয়াতের সরাসরি বয়ান হিসেবে দেখেন-যেখানে জিন-শয়তানের মতো মানুষ-শয়তান থেকেও সতর্ক করা হয়েছে, এবং অধিক ক্ষতিকরটিকে আগে আনা হয়েছে । সামনে আর কোনো আয়াত নেই-এটিই কুরআনের শেষ শব্দ। তাই মুনাসাবার সবচেয়ে চমৎকার দিকটি আল-বিকাঈ এখানেই খোলেন: সূরার শেষ ফিরে আসে তার শুরুতে (আশ্রয়প্রার্থনায়), আর তিন নাম রব-মালিক-ইলাহ (رَبّ، مَلِك، إله) মিলে যায় ফাতিহার আল্লাহ-রব-মালিক-এর সঙ্গে, যেন কুরআনের শেষ প্রান্ত তার সূচনার সঙ্গে গাঁট বেঁধে দেয় ।
পুরো সূরাটা যেন একটা প্রশ্নের চারপাশে ঘোরে-কার কাছে আশ্রয়, আর কীসের অনিষ্ট থেকে? আগের আয়াত পর্যন্ত আমরা জেনেছি একজন আছে, যে চুপিসারে মানুষের বুকের ভেতর কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়, আল্লাহকে স্মরণ করলে সরে যায়, ভুলে গেলে আবার ফিরে আসে। কিন্তু সে আসলে কে? এই শেষ আয়াত পর্দাটা তুলে দেয়: সে এক জাতের নয়-কখনো সে জিন, অদৃশ্য থেকে মনের ভেতর কথা ফেলে; আবার কখনো সে রক্তমাংসের মানুষ, যে হিতাকাঙ্ক্ষী ও দরদির মুখোশ পরে এসে ভালো কথার আড়ালে বিপথে টানে [১][২][৪]। যামাখশারী যে সূক্ষ্ম প্রশ্নটা তোলেন-মানুষ তো অন্যের বুকের ভেতরে ঢুকে কুমন্ত্রণা দিতে পারে না-তার জবাবও সুন্দর: মানুষ বাইরে থেকে এমন কথা বলে যা ধীরে ধীরে হৃদয়ে পৌঁছে সেখানে গেঁথে যায় [৫]। আর আবু বকর যাকারিয়া আরেক স্তর যোগ করেন-সবচেয়ে কাছের শত্রু তো নিজের নফসই, তাই রাসূল (সা.) নফসের অনিষ্ট থেকেও আল্লাহর আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন [১]। আল-বিকাঈ বলেন, এজন্যই অধিক ক্ষতিকর মানুষ-শয়তানকে এখানে আগে আনা হয়েছে, আর তার ওষুধ হলো এমন সঙ্গ এড়িয়ে চলা [৭]। আর ঠিক এখানেই কুরআন থামে-কোনো বিজয়ের ঘোষণায় নয়, বরং বান্দার দুর্বলতা স্বীকার করে রবের কোলে আশ্রয় নেওয়ায়। আল-বিকাঈ যেমন দেখান, সূরার শেষ ফিরে যায় তার নিজের শুরুতে, আর কুরআনের শেষ প্রান্ত গাঁট বাঁধে ফাতিহার সূচনার সঙ্গে-যেন আশ্রয়প্রার্থী বান্দা আবার নতুন করে পাঠ শুরু করার জন্যই থামল [৭]।
ভাবুন, কেউ আপনার পাশে বসে নরম গলায়, দরদভরা মুখে বোঝাচ্ছে-'এটুকু অন্যায়ে কিছু হয় না, সবাই তো করে।' সে হয়তো বন্ধু, হয়তো আপনজন; কিন্তু তার কথাটা ধীরে ধীরে আপনার মনে গেঁথে যাচ্ছে। এটাই মানুষ-শয়তানের কুমন্ত্রণা । আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই মনের ভেতর কু-চিন্তা ফিসফিস করে-তার পেছনে অদৃশ্য জিন-শয়তান । যামাখশারী বলেন, মানুষ বাইরে থেকে কথা বলে, আর সে কথা হৃদয়ে পৌঁছে সেখানে স্থির হয়ে যায় । আয়াতটি দুই উৎসকেই চিনিয়ে দেয়, যাতে আমরা দুদিক থেকেই সতর্ক থাকতে পারি।
এই প্রশ্নটাই যামাখশারী নিজে তুলেছেন এবং জবাব দিয়েছেন। আপত্তি হলো-কুমন্ত্রণা হয় 'সুদূরিন-নাস' অর্থাৎ হৃদয়ের ভেতরে, কিন্তু মানুষ তো অন্যের হৃদয়ে ঢুকতে পারে না, কেবল জিনই পারে । সমাধান: মানুষও কুমন্ত্রণা দেয়, তবে তার নিজস্ব ধরনে-সে বাইরে থেকে এমন কথা বলে যা মানুষের কাছে যুক্তিসংগত শোনায়, তারপর সেই কথা ধাপে ধাপে হৃদয়ে পৌঁছে সেখানে গেঁথে যায় । আহসানুল বায়ান এর রূপটা স্পষ্ট করে-এরা উপদেষ্টা, হিতাকাঙ্ক্ষী ও দয়াবানের বেশে এসে অপরকে বিপথে টানে । অর্থাৎ মুখোশটাই তার অস্ত্র।
এ নিয়ে দুই মত। অধিকতর প্রচলিত পাঠে এ আয়াত ওয়াসওয়াসের বিবরণ-কুমন্ত্রণাকারী দুই জাতের: জিন্নি ও ইনসি, যেমন কুরআন বলেছে শায়াতীনুল ইনসি ওয়াল-জিন্ন । তবে কেউ কেউ বলেন, এ আয়াত আগের 'নাস' শব্দটিরই বিবরণ-অর্থাৎ 'নাস' শব্দে জিনও অন্তর্ভুক্ত। দলিল হিসেবে তাঁরা সূরা জিন আনেন, যেখানে জিনের জন্য রিজাল ও নাফার (পুরুষ মানুষ) ব্যবহৃত হয়েছে । যামাখশারী আবার সূক্ষ্মভাবে বলেন, 'নাস' মানে এখানে 'নাসী' (যারা আল্লাহর হক ভুলে যায়) ধরাই বেশি যুক্তিসংগত, কারণ জিন ও মানুষ-উভয় শ্রেণিই বিস্মৃতির দোষে দুষ্ট ।
আল-বিকাঈ এ প্রশ্নের একটি ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, আয়াতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক ক্ষতিকরকে আগে আনার রীতি (আল-আহাম্ম আল-আদার্র) অনুসরণ করা হয়েছে, আর তিনি মানুষ-শয়তানকে এমন বিপদ হিসেবে দেখেন যা কখনো কখনো জিন-শয়তানের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর । কারণ মানুষ-শয়তান হতে পারে স্ত্রী, সন্তান বা পরিচিতজন-যাদের সঙ্গ ছাড়া কঠিন । এর প্রতিকার হিসেবে তিনি সাধ্যমতো এদের পরিত্যাগ ও দূরত্ব রক্ষার কথা বলেন, এবং সূরা কাহফের সেই আয়াতের দিকে নির্দেশ করেন যেখানে সৎসঙ্গ ধরে রাখা ও গাফেলদের অনুসরণ এড়ানোর তাগিদ আছে ।
ইবন কাসীর বর্ণিত একটি দৃশ্য এর সরল জবাব দেয়: শয়তান মানুষের অন্তরের উপর হাত রেখে বসে থাকে; বান্দা যখন আল্লাহর ইবাদত করে ও তাঁকে স্মরণ করে, তখন সে হাত সরিয়ে পিছিয়ে যায়; আর যখন বান্দা আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন সে আবার চেপে বসে । এটাই 'খান্নাস'-এর স্বভাব-স্মরণে পিছু হটা, গাফলতিতে ফিরে আসা । আল-বিকাঈ যোগ করেন, সতর্ক মুরাকাবা (আত্ম-পর্যবেক্ষণ) থাকলে বান্দা ক্ষতিকর কুমন্ত্রণা ঠেকিয়ে দেয়; নাহলে কু-ভাবনা হামলা করে বসে । আর মানুষ-শয়তানের ক্ষেত্রে ওষুধ সঙ্গ-পরিত্যাগ ।
আল-বিকাঈর দৃষ্টিতে এটাই সূরার সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য। সূরার শেষ ফিরে আসে তার শুরুতে-যেখান থেকে আশ্রয়প্রার্থনা শুরু হয়েছিল, সেখানেই তা সম্পূর্ণ হলো । আরও বিস্ময়কর, কুরআনের একেবারে শেষ শব্দটি গাঁট বেঁধে দেয় ফাতিহার সূচনার সঙ্গে: এ সূরার তিন নাম রব-মালিক-ইলাহ মিলে যায় ফাতিহার আল্লাহ-রব-মালিকের সঙ্গে, যেন কুরআনের সমাপ্তি আর সূচনা এক বৃত্তে মিশে গেল । আল-বিকাঈ বলেন, খতম শেষে পাঠক যেন আবার নতুন করে পাঠ শুরু করার ইশারা পায়-তাই বিজয়ের ঘোষণায় নয়, বান্দার দুর্বলতা স্বীকার করে রবের আশ্রয়ে এসে কুরআন থামে ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
অডিও: EveryAyah.com - মিশারি রাশিদ আল-আফাসী (সুন্দর তিলাওয়াত), মাহমুদ খলিল আল-হুসারী মুআল্লিম (তাজবীদ শিক্ষা)