The Daybreak · 5 আয়াত · মাক্কী
সব আয়াত প্রস্তুত, যাচাইের অপেক্ষায়
এই আয়াত দিয়ে সূরা আল-ফালাক শুরু হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশে-“বলুন”-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং তাঁর মাধ্যমে প্রতিটি মানুষকে শেখানো হচ্ছে কীভাবে আশ্রয় চাইতে হয় । ‘আউযু’ (أعوذ) মানে আমি আশ্রয় নিচ্ছি, আত্মরক্ষা করছি, একজনের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি । মুমিন যখনই কোনো অনিষ্টের ভয় পায়, তার স্বভাব হলো আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাওয়া-অন্য কারো কাছে নয়, নিজের শক্তির ওপরও ভরসা নয় । আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে রবের কাছে-‘রব’ (رب) মানে যিনি লালন-পালন করেন, সৃষ্টি করেন ও পরিচালনা করেন। আর তাঁকে এখানে পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘ফালাক’-এর রব বলে । ‘ফালাক’ (الفلق) শব্দের মূল অর্থ ফেটে যাওয়া, চিরে বের হওয়া । সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও বহুল-গৃহীত মত-ইমাম বুখারী ও ইবনে জারীরের মতে-এর অর্থ প্রভাত বা ঊষা, কারণ রাতের অন্ধকার চিরে আলো বেরিয়ে আসে । আরেক মত-এটি সমস্ত সৃষ্টি, কেননা আল্লাহ অন্ধকারের আবরণ চিরে গাছ, ঝরনা, শিশু, বৃষ্টি-সবকিছু বের করে আনেন । ইমাম তাবারীর মতে আয়াতটি ব্যাপক রাখা হয়েছে, তাই চিরে বের-হওয়া সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত । যিনি অন্ধকার চিরে আলো আনতে পারেন, তিনিই ভয় ও আতঙ্ক দূর করে আশ্রয়প্রার্থীকে নিরাপত্তা দিতে পারেন ।
তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া ও ইবনে কাসীর-এ বর্ণিত আছে যে সূরা ফালাক ও সূরা নাস একই ঘটনায় একসঙ্গে নাযিল হয়। জনৈক ইহুদি (লাবীদ ইবন আ‘সাম) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর জাদু করেছিল-চিরুনি ও চুলে গ্রন্থি বেঁধে ‘যরওয়ান’ কূপে রেখেছিল-যাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম স্বপ্নযোগে বিষয়টি জানালে গ্রন্থিগুলো কূপ থেকে উদ্ধার করা হয়, আর এই দুই সূরা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে এক একটি গ্রন্থি খুলে যেতে থাকে ও তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হন । উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল এই দুই সূরাকে অতুলনীয় বলে অভিহিত করেছেন এবং প্রতি সালাতের পর ও শোয়ার সময় পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন ।
আয়াতের সূচনা ‘কুল’ (قل) অর্থাৎ “বলুন” দিয়ে-যা সরাসরি আদেশ; এর মধ্য দিয়ে নির্দেশটি শুধু রাসূলের নয়, যার কাছেই এই বাণী পৌঁছবে সেই প্রতিটি সৃষ্টির জন্য শিক্ষা ও আদেশ হিসেবে এসেছে । ‘আউযু বিরব্বিল ফালাক’-এখানে আশ্রয়ের জন্য বহু সিফাতের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘রুবূবিয়্যাত’ তথা রবের গুণটি, কারণ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করাই হলো সর্বোচ্চ লালন-পালন-তাই এই সিফাতটিই এখানে সবচেয়ে যথোপযুক্ত । ‘ফালাক’ শব্দটি ‘ফা‘আল’ ওজনে কিন্তু ‘মাফ‘ঊল’-এর অর্থে, অর্থাৎ ‘যা ফাটানো হয়েছে’ । অন্ধকার চিরে আলো বের করার প্রতিচ্ছবিতে আশ্রয়দাতার সামর্থ্যের ইঙ্গিত-যিনি আঁধার চিরতে পারেন, তিনি ভয়ও চিরে দিতে পারেন ।
এটি সূরার প্রথম আয়াত, তাই পূর্ববর্তী কোনো আয়াত নেই; তবে আল-বিকাঈ দেখান যে গোটা কুরআন যেভাবে সূরা ফাতিহার ‘ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা‘ঈন’ (কেবল তোমারই ইবাদত করি ও তোমারই সাহায্য চাই) দিয়ে শুরু হয়েছিল, শেষেও এই আশ্রয়-প্রার্থনা সেই সূচনার সঙ্গে মিলে যায়-সফরের শেষে যেন যাত্রী আবার আপন ঠিকানায় ফেরে । সূরা ইখলাসে তাওহীদ পূর্ণতা পাওয়ার পর স্বাভাবিক পরিণতি হলো একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই দিকে ঝুঁকে পড়া ও তাঁরই আশ্রয় নেওয়া । পরবর্তী আয়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ: প্রথমে কার কাছে আশ্রয় তা স্পষ্ট হলো-‘ফালাক-এর রব’; এরপরের আয়াত ‘মিন শাররি মা খালাক’ বলে দিচ্ছে কিসের অনিষ্ট থেকে-“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে” । আল-বিকাঈর মতে এখানে প্রথমে এমন অনিষ্টের কথা আনা হয়েছে যা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নির্বিশেষে জিন ও মানুষ-শয়তান সবাইকে ব্যাপ্ত করে ।
কল্পনা করুন গভীর রাত-চারদিকে আঁধার, মনে নানা শঙ্কা। তখন মানুষ অপেক্ষায় থাকে কখন প্রভাতের আলো এসে অন্ধকার চিরে দেবে। ঠিক এই দৃশ্যকেই আল্লাহ আশ্রয়ের পাঠ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি বলছেন: “বলুন, আমি আশ্রয় নিচ্ছি প্রভাতের রবের কাছে।” ‘ফালাক’ (الفلق) শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ফেটে যাওয়া, চিরে বের হওয়ার ছবি-রাতের পর্দা চিরে যেমন ভোর বেরিয়ে আসে [১], বীজের বুক চিরে গাছ, মেঘ চিরে বৃষ্টি, গর্ভের আবরণ চিরে শিশু [১][৬][৭]। বহু মুফাসসির, বিশেষত ইমাম বুখারী ও ইবনে জারীরের মতে এর প্রসিদ্ধ অর্থ প্রভাত [১][৪][৫][৬], আবার কেউ এর ব্যাপক অর্থ নিয়েছেন-আল্লাহ যা কিছু অন্ধকার চিরে সৃষ্টি করেছেন তার সবই [১][৭]। আর আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে ‘রব’ (رب)-এর কাছে, কারণ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করাই তো সবচেয়ে বড় লালন [৭]। যিনি প্রতিদিন আঁধার ভেঙে আলো আনেন, তিনিই তো ভয়ের আঁধার ভেঙে নিরাপত্তার ভোর আনতে পারেন [২]। তাই বিপদের প্রথম মুহূর্তেই বান্দা যেন অন্য কারো কাছে নয়, নিজের সামর্থ্যের ওপরও নয়-সোজা মাওলার কাছে ছুটে যায় [১][৭]। আর এখানে আশ্রয়দাতাকে চিনিয়ে দেওয়ার পর পরের আয়াত খুলে দেবে আশ্রয় চাওয়ার বিষয়-“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে” [৬][৭]।
একটি ছোট্ট শিশু রাতের অন্ধকারে ভয় পেলে যেমন দৌড়ে গিয়ে বাবার বুকে আশ্রয় নেয়, তেমনি মানুষও যখন কোনো অনিষ্টের ভয় পায়, তার স্বভাব হওয়া উচিত সরাসরি আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া । আর আল্লাহকে এখানে পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘ফালাক’ অর্থাৎ প্রভাতের রব বলে-যিনি প্রতিদিন রাতের গাঢ় আঁধার চিরে ভোরের আলো নিয়ে আসেন । ভাবুন, রাতভর শঙ্কায় থাকা মানুষ যেমন ভোরের অপেক্ষায় থাকে, তেমনি ভীত বান্দা আশ্রয় চেয়ে নিরাপত্তার প্রভাত উদয়ের আশায় থাকে । যিনি প্রতিদিন আঁধার ভাঙতে পারেন, তিনিই ভয় ভাঙতে পারেন।
‘ফালাক’ (الفلق)-এর মূল অর্থ ফাটানো বা চিরে ফেলা । সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও বহুল-গৃহীত মত-যা ইমাম বুখারী ও ইবনে জারীর গ্রহণ করেছেন-এর অর্থ প্রভাত বা ঊষা, কারণ রাতের অন্ধকার চিরে আলো বেরিয়ে আসে । দ্বিতীয় মত: এর অর্থ সমগ্র সৃষ্টি, কেননা আল্লাহ অন্ধকারের আবরণ চিরে গাছ, ঝরনা, শিশু, বৃষ্টি প্রভৃতি বের করেন । ইমাম তাবারী বলেন, আয়াতটি অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে, তাই চিরে বের-হওয়া সবকিছুই এর উদ্দেশ্য । আবার কেউ কেউ একে জাহান্নামের একটি স্থান বলেছেন, যদিও সেই বর্ণনাকে মুনকার বলা হয়েছে ।
আল-বিকাঈ চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আশ্রয় চাওয়া বা ‘ই‘আযা’ (অনিষ্ট থেকে রক্ষা) আল্লাহর ‘রুবূবিয়্যাত’ তথা লালন-পালনের গুণের সঙ্গেই সবচেয়ে মানানসই । কারণ কাউকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোই হলো সবচেয়ে বড় লালন-পালন-একজন প্রকৃত প্রতিপালক তো তিনিই যিনি বিপদ থেকে তাঁর প্রতিপাল্যকে আগলে রাখেন । ‘রব’ (رب) শব্দটি একইসঙ্গে সৃষ্টি, লালন ও পরিচালনার অর্থ বহন করে। তাই যখন বান্দা ভয় থেকে আশ্রয় চায়, তখন আল্লাহকে ঠিক সেই গুণেই ডাকা হয় যে গুণ এই আশ্রয়দানের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িত ।
তাফসীর আবু বকর যাকারিয়ায় এসেছে যে কুরআনের নানা স্থানে নবীগণের আশ্রয়-প্রার্থনার দৃষ্টান্ত আছে-মারইয়াম বলেছিলেন তিনি দয়াময়ের আশ্রয় চান, নূহ আলাইহিস সালাম না-জানা বিষয় চাওয়া থেকে আল্লাহর পানাহ চেয়েছেন, মূসা আলাইহিস সালাম মূর্খের মতো কথা বলা থেকে আশ্রয় চেয়েছেন । এ থেকে স্পষ্ট, প্রতিটি বিপদ ও অনিষ্টের মোকাবিলায় আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাওয়া মুমিনের কাজ-অন্য কারো কাছে নয় । পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি বিমুখ হয়ে নিজের শক্তি ও কৌশলের ওপর ভরসা করাও তার রীতি নয় ; বরং বিপদের প্রথম মুহূর্তেই মাওলার দিকে ছুটে যাওয়াই তাওয়াক্কুলের পরিচয় ।
তাফসীর আহসানুল বায়ানে এ বিষয়ে দুটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে । প্রথমত, আল্লাহ যেমন রাতের অন্ধকার দূর করে দিনের উজ্জ্বলতা আনতে পারেন, তেমনি তিনি ভয় ও আতঙ্ক দূর করে আশ্রয়প্রার্থীকে নিরাপত্তা দিতে পারেন-অর্থাৎ আঁধার-ভাঙার সামর্থ্যই নিরাপত্তা-দানের সামর্থ্যের প্রতীক । দ্বিতীয়ত, মানুষ রাতে যেমন প্রভাতের অপেক্ষায় থাকে, তেমনি ভীত মানুষ আশ্রয়-প্রার্থনার মাধ্যমে সফলতার প্রভাত উদয়ের আশায় থাকে । আল-বিকাঈও যোগ করেন, এই দৈনিক ভোর-উদয় কিয়ামতের মহাফালাকেরও প্রতিচ্ছবি-যেদিন আল্লাহ ধ্বংসের আঁধার চিরে পুনরুত্থান ঘটাবেন; যিনি এসব পারেন, তিনি আশ্রয়প্রার্থীকে সব ভয় থেকে রক্ষাও করতে পারেন ।
এই প্রথম আয়াত স্থির করে দেয় কার কাছে আশ্রয়-‘ফালাক-এর রব’; এরপরই পরের আয়াত ‘মিন শাররি মা খালাক’ বলে দেয় কিসের অনিষ্ট থেকে-“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে” । যামাখশারী ব্যাখ্যা করেন, ‘মা খালাক’ মানে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট-মানুষের পাপ-অবিচার থেকে শুরু করে হিংস্র জন্তু ও বিষাক্ত প্রাণীর ক্ষতি পর্যন্ত । আল-বিকাঈ দেখান, প্রথমে এমন ব্যাপক অনিষ্টের কথা আনা হয়েছে যা প্রকাশ্য ও গোপন উভয়ভাবে জিন ও মানুষ-শয়তান সবাইকে ব্যাপ্ত করে । অর্থাৎ আশ্রয়দাতার পরিচয়ের পরই আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি ক্রমে স্পষ্ট হতে থাকে-সাধারণ থেকে নির্দিষ্টের দিকে।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
প্রভাতের রবের কাছে আশ্রয় চাওয়ার পর সবার আগে যে অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হলো তা হলো ‘মা খালাক্ব’, অর্থাৎ তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট । এটি এক ব্যাপকার্থক বাক্য, যা সকল ক্ষতিকর সৃষ্টিকে শামিল করে, শয়তান ও তার বংশধর থেকে শুরু করে জাহান্নাম এবং যেকোনো ক্ষতিকর প্রাণী বা বস্তু । ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘শর’ (অনিষ্ট) দুই প্রকার, এক প্রত্যক্ষ বিপদ যা সরাসরি কষ্ট দেয়, দুই যা বিপদের কারণ হয়, যেমন কুফর ও শিরক । লক্ষণীয়, এখানে বলা হয়েছে ‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট’, অর্থাৎ অনিষ্টটা সৃষ্টির আচরণ বা ফলাফলে, আল্লাহর সৃষ্টিকর্মে নয়; তাঁর সৃষ্টি কল্যাণময়, অকল্যাণ আসে সৃষ্টির ভুল ব্যবহারে ।
এই বাক্যটি ‘আম’ তথা ব্যাপকার্থক; এক কথাতেই সমস্ত অনিষ্ট চলে আসে । তবু এর পরে তিনটি নির্দিষ্ট অনিষ্ট আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে (পরের আয়াতগুলোতে), যেগুলো প্রায়ই বিপদের কারণ হয়, যদিও সেগুলো এই ব্যাপক বাক্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল ।
আগের আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছিল ‘রব্বুল ফালাক্ব’ তথা প্রভাতের রবের কাছে, যিনি অন্ধকার চিরে আলো ফোটান; সেই মহান রবের কাছেই এখন সমস্ত সৃষ্ট অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হলো । এটি সাধারণ আশ্রয়, আর পরের তিন আয়াতে আসবে নির্দিষ্ট তিনটি অনিষ্ট, যেন আগে গোটা আকাশ, তারপর বিশেষ মেঘগুলো দেখিয়ে দেওয়া ।
ভাবুন, কেউ বিপদের আশঙ্কায় শক্তিশালী অভিভাবকের আশ্রয়ে যায়। বান্দাও তেমনি প্রভাতের রবের কাছে আশ্রয় নিয়ে প্রথমেই বলে, তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার সমস্ত অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করুন [১][২]। এক বাক্যেই ঢুকে পড়ে চেনা-অচেনা সব ক্ষতি, শয়তান থেকে হিংস্র জন্তু, রোগ থেকে বিষ [২][৩]। আর সুন্দর ব্যাপার হলো, অনিষ্ট বলা হয়েছে ‘সৃষ্টির’, আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের নয়, কারণ তাঁর সৃষ্টি প্রজ্ঞাময়; ক্ষতি জন্মে সৃষ্টির অপব্যবহারে [১]। এই ব্যাপক আশ্রয়ের পরেই পরের আয়াতগুলো বিশেষ কয়েকটি বিপদের নাম ধরে আশ্রয় চাইবে।
কেউ অচেনা শহরে রাতে পৌঁছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে, যেখানে সব বিপদ থেকে বাঁচা যায়। বান্দাও তেমনি প্রভাতের রবের কাছে আশ্রয় নিয়ে বলে, আপনার সৃষ্ট সবকিছুর অনিষ্ট থেকে আমাকে বাঁচান । এই এক বাক্যেই ধরা পড়ে দৃশ্য-অদৃশ্য সব ক্ষতি, কারণ ক্ষতি যেখান থেকেই আসুক, সবকিছুই তো তাঁর সৃষ্টি, আর সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণে ।
ইবনুল কাইয়িমের মতে অনিষ্ট দুই প্রকার, এক যা সরাসরি কষ্ট দেয় (যেমন রোগ, হিংস্র প্রাণী), দুই যা বিপদের কারণ হয় (যেমন কুফর ও শিরক, যা পরকালের ধ্বংস ডেকে আনে) । আহসানুল বায়ানে বলা হয়েছে, এতে শয়তান ও তার বংশধর, জাহান্নাম এবং ক্ষতিকর সবকিছু শামিল । তাই বাক্যটি ছোট হলেও এর আশ্রয়ের ছায়া বিশাল।
এটি একটি সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। অনিষ্টকে সৃষ্ট বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে নয় । কারণ আল্লাহর সৃষ্টি প্রজ্ঞা ও কল্যাণে পূর্ণ; অকল্যাণ জন্ম নেয় সৃষ্টির আচরণে বা অপব্যবহারে। বিষ আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু তা প্রাণ বাঁচাতেও লাগে, প্রাণ নিতেও পারে; অনিষ্টটা তার ব্যবহারে । এ ভাষা আল্লাহর প্রজ্ঞাকে নিষ্কলুষ রাখে।
‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট’ বললেই সব অনিষ্ট চলে আসে; এ বাক্যই আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল । তবু এর পরে তিনটি নির্দিষ্ট অনিষ্ট, রাতের অন্ধকার, জাদু ও হিংসা, আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ এগুলো বিশেষভাবে ও প্রায়ই বিপদের কারণ হয় । সাধারণের পরে বিশেষকে আনা গুরুত্ব ও সতর্কতা বাড়ায়, যেন গুরুত্বপূর্ণ বিপদগুলো আলাদা মনোযোগ পায়।
এটি শেখায়, প্রকৃত আশ্রয় কেবল সৃষ্টির স্রষ্টার কাছেই। যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তো সেই সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে বাঁচাতে সক্ষম । মানুষ অসংখ্য দৃশ্য-অদৃশ্য বিপদের মাঝে বাস করে, যার সব সে চেনেও না; তাই সব সৃষ্ট অনিষ্টকে এক বাক্যে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
ব্যাপক অনিষ্টের কথা বলার পর এখানে প্রথম নির্দিষ্ট অনিষ্টের নাম এলো, ‘গাসিক্ব ইযা ওয়াক্বাব’, অর্থাৎ অন্ধকার রাত যখন গভীর হয়ে ছেয়ে যায় । ‘গাসিক্ব’ অর্থ অন্ধকার বা রাত্রি, আর ‘ওয়াক্বাব’ অর্থ অন্ধকার পূর্ণরূপে বেড়ে যাওয়া বা ঢেকে ফেলা । রাতের আঁধারেই হিংস্র জন্তু, ক্ষতিকর পোকামাকড় ও অপরাধপ্রবণ মানুষ আপন উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে, তাই বিশেষভাবে এই সময়ের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে । কোনো কোনো মুফাসসির ‘গাসিক্ব’-কে অস্তগামী চাঁদ অর্থেও নিয়েছেন ।
আগের আয়াতের ব্যাপক অনিষ্টের মধ্যে এটি অন্তর্ভুক্ত হলেও আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে গুরুত্বের জন্য । ‘গাসিক্ব ইযা ওয়াক্বাব’ শব্দচিত্রে ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসা অন্ধকারের ছবি, যা ভয় ও অসহায়ত্বের অনুভূতি জাগায় ।
আগের আয়াতে চাওয়া হয়েছিল সব সৃষ্ট অনিষ্ট থেকে আশ্রয়; এই আয়াত সেই ব্যাপকতা থেকে নেমে আসে একটি নির্দিষ্ট, পরিচিত বিপদে, রাতের অন্ধকার । আর পরের আয়াতে আসবে আরেক নির্দিষ্ট অনিষ্ট, গ্রন্থিতে ফুঁ দেওয়া জাদু; অর্থাৎ সাধারণ থেকে বিশেষে নেমে আসার ধারাবাহিকতায় একে একে বড় বিপদগুলোর নাম নেওয়া হচ্ছে ।
দিনের আলোয় বিপদ চোখে পড়ে, সাবধান হওয়া যায়; কিন্তু রাত যখন গাঢ় হয়ে সব ঢেকে ফেলে, তখন অচেনা আশঙ্কারা জেগে ওঠে, হিংস্র প্রাণী, ক্ষতিকর কীট, আড়ালে ওঁত পেতে থাকা অপরাধী [১][২]। তাই সব অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার পর বান্দা বিশেষভাবে এই ছেয়ে-আসা অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চায়, যখন সে সবচেয়ে অসহায় বোধ করে [২][৩]। কেউ কেউ একে অস্তগামী চাঁদের অন্ধকার অর্থেও বুঝেছেন [৫]। ব্যাপক আশ্রয়ের পর এই নির্দিষ্ট আশ্রয় যেন বলে দেয়, আল্লাহ কেবল বড় বিপদ নয়, প্রতিদিনের চেনা ভয় থেকেও আশ্রয়দাতা।
কল্পনা করুন গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেছে, চারদিক নিকষ অন্ধকার; তখন ছোট্ট শব্দও বুকে কাঁপন ধরায়, কারণ বিপদ দেখা যায় না । আয়াতটি সেই অনুভূতিকেই ছুঁয়ে বলে, ছেয়ে-আসা অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও । রাতেই তো হিংস্র জন্তু ও আড়ালের অপরাধীরা বেরোয়; তাই এই সময়ের অসহায়ত্বে রবের আশ্রয়ই সবচেয়ে বড় ভরসা ।
‘গাসিক্ব’ অর্থ অন্ধকার বা রাত্রি, আর ‘ওয়াক্বাব’ অর্থ সেই অন্ধকার পূর্ণরূপে বেড়ে যাওয়া বা চারদিক ঢেকে ফেলা । অর্থাৎ আয়াতের ছবি হলো, রাত যখন গাঢ় হয়ে সব আচ্ছন্ন করে ফেলে। কোনো কোনো মুফাসসির ‘গাসিক্ব’-কে অস্তগামী চাঁদ অর্থেও নিয়েছেন, কারণ চাঁদ ডুবে গেলে অন্ধকার নামে ।
কারণ রাতের আঁধারেই অনিষ্টের আশঙ্কা বেশি। হিংস্র প্রাণী, ক্ষতিকর পোকামাকড়, আর অপরাধপ্রবণ মানুষ রাতেই নিজেদের উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়, আর অন্ধকারে মানুষ সবচেয়ে অসহায় থাকে । তাই ব্যাপক অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার পরেও বিশেষভাবে এই সময়ের অনিষ্ট আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে, যেন এই পরিচিত ভয়টিকে অবহেলা না করা হয় ।
কিছু মুফাসসির ‘গাসিক্ব’-কে রাত না বুঝে অস্তগামী চাঁদ অর্থে নিয়েছেন; কারণ চাঁদ যখন ডুবে যায়, তখনই গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে । ফলে অর্থ দাঁড়ায়, সেই অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়, যা চাঁদ ডুবে গেলে ছড়িয়ে পড়ে। উভয় ব্যাখ্যাই একই দিকে যায়, আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে অন্ধকার ও তাতে লুকিয়ে থাকা বিপদ থেকে ।
আগের আয়াতে সব সৃষ্ট অনিষ্ট ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবু রাতের অন্ধকারকে আলাদা করে আনা হয়েছে গুরুত্ব দিতে । এটি অলংকারের একটি পরিচিত রীতি, সাধারণের পর বিশেষকে উল্লেখ করা, যাতে প্রায়-ঘটে এমন বড় বিপদগুলো আলাদা মনোযোগ পায়। এরপরের আয়াতগুলোতেও একইভাবে জাদু ও হিংসার কথা আলাদা করে আসবে ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
এই আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে নাফফাছাত (النفّاثات)-এর অনিষ্ট থেকে-যারা গিরায় ফুঁক দেয়, অর্থাৎ জাদুকর নারী, কিংবা ব্যাপকভাবে জাদুকর আত্মা ও দলগুলো । নাফছ (نفث) শব্দের অর্থ থুথুর সঙ্গে হালকা ফুঁ দেওয়া, আর উকাদ (العقد) হলো উকদা (عقدة) তথা গিরার বহুবচন । জাদুকর সুতা বা দড়িতে গিরা বেঁধে তাতে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেয়-এ-ই তাদের ক্রিয়াপদ্ধতি, যাকে কুরআন এমন সূক্ষ্ম রূপকল্পে ধরেছে । স্ত্রীলিঙ্গ নাফফাছাত নিয়ে তাফসিরকারগণ ব্যাখ্যা দেন: কেউ বলেন এটি প্রকৃত নারীদের বিশেষণ, কেউ বলেন উহ্য আন-নুফূস (النفوس) তথা আত্মার বিশেষণ, ফলে নর-নারী উভয়েই এতে অন্তর্ভুক্ত হয় । ইবনে কাসীর এখানে নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত জাদুর সুপরিচিত ঘটনা বর্ণনা করেন-লুবাইদ ইবনে আসামের গেরো-বাঁধা জাদু, কূপ থেকে তা বের করা এবং এই দুই সূরা পাঠে আল্লাহর আরোগ্য । জাদুর নিজস্ব প্রভাব নিয়ে যামাখশারীর মুতাযিলি অবস্থান থাকলেও আহলে সুন্নাহ কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে এর বাস্তবতা ও প্রভাব স্বীকার করেন । এখানে শর্ত-ছাড়া নিঃশর্তভাবে অনিষ্টের কথা বলা হয়েছে-কেননা প্রতিটি জাদুকরই অনিষ্টকর ।
এ আয়াত-সম্পর্কিত যে পটভূমি সূত্রগুলো উল্লেখ করে তা হলো নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত জাদুর ঘটনা: এক ইহুদি-বর্ণনায় লুবাইদ ইবনে আসাম-নবী (সঃ)-এর চুল ও চিরুনির দাঁত হস্তগত করে গেরো-বাঁধা জাদু করে যারওয়ান কূপে রাখে; এতে নবী (সঃ) অসুস্থ হন, পরে জিবরাঈল (আঃ)-এর জানানো অনুযায়ী তা বের করা হয় এবং এই দুই সূরা পাঠে গেরোগুলো একে একে খুলে গিয়ে তিনি সুস্থ হন । নাজম আদ-দুরারও বলে যে এ আয়াত নাজিল হওয়ার কারণ ছিল এক ইহুদি কর্তৃক নবী (সঃ)-কে জাদু করা ও তাঁর অসুস্থ হওয়া ।
অলংকারের প্রথম দিক হলো নির্ধারিত-অনির্ধারিতের সূক্ষ্ম পার্থক্য: এখানে আন-নাফফাছাত (النفّاثات) মা'রিফা তথা নির্ধারিতরূপে এসেছে, কারণ প্রতিটি জাদুকরই অনিষ্টকর; অথচ আগের আয়াতে গাসিক (غاسق) ও পরের আয়াতে হাসিদ (حاسد) এসেছে নাকিরা তথা অনির্ধারিতরূপে, কেননা প্রত্যেক রাত বা প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতিকর নয় । দ্বিতীয়ত, নাফফাছাত-এ অতিশয়োক্তির সীগা (মুবালাগা) এবং বহুবচন-স্ত্রীলিঙ্গ একসঙ্গে ব্যবহৃত, যাতে কম মাত্রার জাদুও অগ্রাধিকারক্রমে এর অন্তর্ভুক্ত হয় । তৃতীয়ত, জাদুর সমগ্র জটিল কর্মকে কুরআন ধরেছে এক ক্ষুদ্র মূর্ত দৃশ্যে-গিরায় ফুঁক-যা ভয়াবহতাকে দৃশ্যমান করে তোলে ।
আগের আয়াতে রাত্রির অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছিল; নাজম আদ-দুরার দেখায় যে জাদু হলো সেই অন্ধকার-অনিষ্টের সবচেয়ে চরম ও গভীর রূপ-যা শিরা-উপশিরায় প্রবেশ করে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্রের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়, দেহকে শীর্ণ করে, এমনকি প্রাণ পর্যন্ত নেয়; তাই অন্ধকারের অনিষ্টের পরেই জাদুর অনিষ্টের উল্লেখ এসেছে । আর পরের আয়াতে হিংসুকের অনিষ্টের সঙ্গে এর যোগ এই যে-জাদু, রাত ও হিংসা তিনটিই গোপন, লুকানো অনিষ্ট, যা মানুষকে অজান্তে আঘাত করে; এ কারণেই সাধারণ "যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট" বলার পরও বিশেষভাবে এই গোপন অনিষ্টগুলোকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে । যামাখশারী মনে করিয়ে দেন, হিংসা থেকেই জাদুর জন্ম নেয়-ইহুদিরা হিংসাবশতই নবী (সঃ)-কে জাদু করেছিল ।
কল্পনা করুন গভীর রাতে কেউ গোপনে এক টুকরো সুতায় একের পর এক গিরা বাঁধছে, প্রতিটি গিরায় ফিসফিস মন্ত্র পড়ে থুথুর সঙ্গে হালকা ফুঁ দিচ্ছে-এই-ই নাফফাছাত (النفّاثات)-এর দৃশ্য, গিরায় ফুঁকদানকারী জাদুকরের অনিষ্ট, যা থেকে এ আয়াতে রবের কাছে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে [১][২][৫]। নাফছ মানে থুথুমিশ্রিত ফুঁ, আর উকাদ মানে গিরা; জাদুকর দড়িতে গেরো বেঁধে তাতে অভিশাপ ফুঁকে দেয় [১][৭]। শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গে এসেছে বলে কেউ একে নারীদের, কেউ আত্মার বিশেষণ বলেছেন-ফলে অর্থে নর-নারী উভয় জাদুকরই ঢুকে পড়ে [১][২][৭]। এর সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত সেই গেরো-বাঁধা জাদু, যা এই দুই সূরা পাঠেই একে একে খুলে গিয়েছিল [৪]। লক্ষ করুন বিন্যাসটি: আগের আয়াতে অন্ধকার রাতের অনিষ্ট, এ আয়াতে জাদু-অন্ধকার-অনিষ্টের চূড়ান্ত রূপ, যা সংসার ভাঙে ও দেহ-প্রাণ কাড়ে [৭]-আর এরপরই আসে হিংসুকের অনিষ্ট, কেননা হিংসা থেকেই জাদুর জন্ম [৪][৬]। তিনটিই গোপন আঘাত, অদৃশ্যে হানা দেয়; তাই সাধারণভাবে সব অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার পরও বিশেষভাবে এই লুকানো শত্রুদের নাম ধরে আশ্রয় চাওয়া হলো-যাতে বান্দা জানে, যে শত্রু চোখে দেখা যায় না, তার থেকেও রক্ষাকর্তা একমাত্র তার রব [৬]।
কল্পনা করুন একজন জাদুকর একটি সুতা বা দড়ি নিয়ে তাতে কয়েকটি গিরা বা গেরো বাঁধছে, আর প্রতিটি গিরায় কিছু মন্ত্র পড়ে থুথুর সঙ্গে হালকা করে ফুঁ দিচ্ছে-এটাই নাফছ (نفث) তথা ফুঁ দেওয়া, আর উকাদ (العقد) হলো গিরা । জাদুকর যাকে ক্ষতি করতে চায় তার চুল বা ব্যবহৃত কোনো জিনিস জোগাড় করে তাতেই এই গেরো-বাঁধা জাদু করে । জালালাইন স্পষ্ট করেন, তারা সুতায় গিরা বাঁধে এবং থুথু ছাড়াই বা থুথুসহ কিছু মন্ত্র পড়ে তাতে ফুঁ দেয় । এই গোটা অপকর্মটিকেই কুরআন এক ক্ষুদ্র দৃশ্যে ধরেছে।
না, কেবল নারীদেরই বোঝানো হয়নি। আন-নাফফাছাত (النفّاثات) স্ত্রীলিঙ্গ হওয়ায় তাফসিরকারগণ কয়েকটি ব্যাখ্যা দেন। প্রথম মত: এটি প্রকৃত নারীদের বিশেষণ, অর্থাৎ জাদুকর নারী । দ্বিতীয় মত: এটি উহ্য আন-নুফূস (النفوس) তথা আত্মার বিশেষণ-তাহলে অর্থ দাঁড়ায় গিরায় ফুঁকদানকারী মন্দ আত্মাদের অনিষ্ট । আবার এটি ফুঁকদানকারীদের একটি দল বা সমষ্টিকেও বোঝাতে পারে, যাতে নর-নারী উভয়ই অন্তর্ভুক্ত । মোটকথা উদ্দেশ্য হলো জাদুর মতো জঘন্য কর্মের কর্তা-সে নারী হোক বা পুরুষ-সকলের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া ।
এ বিষয়ে তাফসিরে দুটি ধারা দেখা যায়। যামাখশারী মুতাযিলি অবস্থান থেকে বলেন জাদুর নিজস্ব কোনো প্রকৃত প্রভাব নেই; তবে তিনিও স্বীকার করেন যে কখনো আল্লাহ পরীক্ষাস্বরূপ কিছু ঘটিয়ে দেন, যাতে দৃঢ়-বিশ্বাসী আর অজ্ঞ-গণ আলাদা হয়ে যায় । কিন্তু এই মতের বিপরীতে আহলে সুন্নাহ কিতাব ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে জাদুর বাস্তবতা ও প্রভাব-উভয়ই স্বীকার করেন, কেননা নবী (সঃ)-কে চিরুনি ও চুলে জাদু করা হয়েছিল এবং তা থেকে আশ্রয় চাওয়ারই নির্দেশ এসেছে । নাজম আদ-দুরারও বলেন, জাদু আল্লাহর অনুমতিক্রমে রোগ ঘটায়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে ।
হ্যাঁ। ইবনে কাসীর ও নাজম আদ-দুরার উভয়েই নবী (সঃ)-এর ওপর কৃত জাদুর সুপরিচিত ঘটনা উল্লেখ করেন । এক ইহুদি-বর্ণনায় লুবাইদ ইবনে আসাম-নবী (সঃ)-এর কয়েকটি চুল ও তাঁর চিরুনির দাঁত হস্তগত করে তাতে গেরো-বাঁধা জাদু করে এবং তা যারওয়ান কূপে রাখে; এতে নবী (সঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন । পরে জিবরাঈল (আঃ) তা জানালে নবী (সঃ) লোক পাঠিয়ে কূপ থেকে জাদুর গেরোগুলো বের করান; বর্ণনায় এতে বারোটি গিরা ছিল, প্রতিটিতে একটি সূচ বিদ্ধ । এরপর এই দুই সূরা নাজিল হয়, এবং প্রতিটি আয়াত পাঠে একটি করে গিরা খুলে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হন ।
সুস্থ হওয়ার পর সাহাবিগণ সেই জাদুকারীকে শাস্তি দেওয়ার কথা বললে নবী (সঃ) তা করেননি । সহিহ বুখারির বর্ণনায় তিনি বলেন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, তিনি আমাকে আরোগ্য দিয়েছেন; আমি মানুষের মধ্যে মন্দ বা ফাসাদ ছড়ানো পছন্দ করি না । জাদুকৃত হওয়া সত্ত্বেও তিনি জাদুকারীকে একটি কটু কথাও বলেননি, ধমকও দেননি, এমনকি তাকে দেখে মুখও মলিন করেননি । এতে যেমন তাঁর অসাধারণ ক্ষমাশীলতা ফুটে ওঠে, তেমনি বোঝা যায় প্রকৃত নিরাময় ও রক্ষা একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসে-আর সেই রক্ষার বাহন ছিল এই কুরআনি আশ্রয়-প্রার্থনা ।
কারণ এই অনিষ্ট গোপন ও লুকানো। যামাখশারী প্রশ্ন তুলে নিজেই উত্তর দেন: 'যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে'-এ তো সব অনিষ্টকেই ঢেকে নেয়; তবু রাত, জাদুকর ও হিংসুকের কথা আলাদা করে বলা হলো কেন? কারণ এদের অনিষ্ট গোপন, মানুষকে অজান্তেই আঘাত করে, যেন গোপনে আক্রমণ করে । তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সেই, যে এমনভাবে ফন্দি আঁটে যা তুমি টেরও পাও না । লক্ষণীয়, এখানে নাফফাছাত নির্ধারিতরূপে এসেছে কারণ প্রতিটি জাদুকরই অনিষ্টকর, অথচ গাসিক ও হাসিদ অনির্ধারিত, কারণ প্রত্যেক রাত বা প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতিকর নয় ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
এই আয়াতে ফালাকের রবের কাছে আশ্রয় প্রার্থনার শেষ ও সবচেয়ে গূঢ় অনিষ্টটি উল্লেখ করা হয়েছে-হিংসুকের (حاسد) হিংসা, যখন সে হিংসা করে। হাসাদ (حسد)-এর অর্থ, আল্লাহ কোনো বান্দাকে যে নেয়ামত, শ্রেষ্ঠত্ব বা গুণ দান করেছেন তা দেখে ভেতরে দগ্ধ হওয়া এবং সেই নেয়ামতের অবসান কামনা করা । মোফাসসিরগণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করিয়েছেন-আয়াতে শব্দটি নকিরাহ (অনির্দিষ্ট) রাখা হয়েছে, কারণ প্রত্যেক হিংসুক নিন্দনীয় নয়; কল্যাণের ক্ষেত্রে গিবতাহ বা প্রশংসিত আকাঙ্ক্ষা আছে, যা হাসাদ নয় । আবার বলা হয়েছে ‘যখন সে হিংসা করে’-অর্থাৎ যতক্ষণ হিংসা মনের ভেতরেই থাকে, ততক্ষণ কেবল হিংসুকই নিজে দগ্ধ হয়, অন্যের কোনো ক্ষতি হয় না; অনিষ্ট ঘটে তখনই যখন সে তা প্রকাশ করে এবং কথায়-কাজে, বদনজরে বা অন্য কৌশলে তার দাবি অনুসারে কাজ করে । মোফাসসিরগণ স্মরণ করিয়েছেন-এই হিংসাই ছিল আকাশে প্রথম গুনাহ (ইবলীসের আদমের প্রতি) ও পৃথিবীতে প্রথম গুনাহ (আদমপুত্রের) , এবং এই হিংসা থেকেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর জাদু করা হয়েছিল । তাই দুটি মুআওয়িযাতাইনের শেষে এই নিগূঢ়, গোপন, অদৃশ্যভাবে আঘাতকারী অনিষ্টটির বিরুদ্ধেই রবের আশ্রয় চাওয়া হয়েছে ।
মোফাসসিরগণ মুআওয়িযাতাইন (ফালাক ও নাস) নাযিলের একটি প্রসিদ্ধ কারণ বর্ণনা করেছেন: ইহুদিদের প্ররোচনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেবারত এক বালক তাঁর চিরুনির কয়েক গোছা চুল ও কয়েকটি দাঁত সংগ্রহ করে দেয়, এবং লাবীদ ইবনুল আ‘সাম নামক ইহুদি তাতে জাদু করে যারওয়ান কূপে গ্রন্থিবদ্ধ করে রাখে; নবী অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে অবহিত করলে আলী, যুবায়ের ও আম্মার (রাঃ) কূপ থেকে এগারোটি গ্রন্থিযুক্ত একটি সুতা বের করে আনেন; এই দুই সুরা নাযিল হলে প্রতিটি আয়াত পাঠে একটি করে গ্রন্থি খুলে যায় ও তিনি সুস্থ হন । আর এই গোটা ষড়যন্ত্রের মূল কারণ ছিল হিংসা-তাই সুরার শেষে স্পষ্টভাবে হিংসুকের অনিষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে ।
আয়াতের ভাষায় কয়েকটি সূক্ষ্ম অলংকার মোফাসসিরগণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, حاسد শব্দটি নকিরাহ তথা অনির্দিষ্ট রাখা-কারণ প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতিকর নয় ও সব হিংসা নিন্দনীয় নয়; পক্ষান্তরে আগের আয়াতে النَّفّاثات নির্দিষ্ট করা হয়েছে, কারণ প্রত্যেক ফুঁৎকারিনীই অনিষ্টকারিণী । দ্বিতীয়ত, ইসম ফায়িল ‘حاسد’ ব্যবহার করে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যার চরিত্রে হিংসা স্থায়ীভাবে প্রোথিত । তৃতীয়ত, ‘إذا حَسَدَ’ শর্তের সংযোজন এক চমৎকার কয়দ বা সীমাবদ্ধকরণ: হিংসা প্রকাশ পেলে তবেই অনিষ্ট, গোপন থাকলে কেবল হিংসুকই পীড়িত । যামাখশারী উমর ইবন আবদুল আযীযের বাণী উদ্ধৃত করেছেন: ‘হিংসুকের চেয়ে মজলুমের অধিক সদৃশ কোনো জালিম আমি দেখিনি’ । চতুর্থত, সাধারণ ‘مِن شَرِّ ما خَلَقَ’-এর পরেও তিনটি অনিষ্ট বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ এগুলো গোপনে, অজান্তে আঘাত করে-যেন গুপ্তঘাতকের মতো .
আগের আয়াতে গ্রন্থিতে ফুঁৎকারদানকারিণী জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে; এই আয়াত তার মূল চালিকাশক্তিকে উন্মোচন করে-কারণ জাদু ও মানুষের প্রতি অধিকাংশ অনিষ্টের সবচেয়ে বড় প্রেরণাই হলো হিংসা । আল-বিকাঈ এই সংযোগকে স্পষ্ট করেছেন: ‘যেহেতু জাদু ও অন্যান্য পীড়নের সবচেয়ে বড় বাহক হিংসা’, তাই আগের আয়াতের পরে স্বাভাবিকভাবেই হিংসুকের কথা এসেছে । তিনি আরও দেখিয়েছেন যে এটিই সুরার শেষ আয়াত, এবং এর মাধ্যমে ‘সুরার শেষ তার শুরুর দিকে ফিরে যায়’-কেননা সূচনায় ছিল সাধারণ ‘সৃষ্টির অনিষ্ট’ আর শেষে এসে সবচেয়ে গূঢ় ও সর্বনাশা অনিষ্ট হিংসায় তা পরিণতি পেয়েছে । যেহেতু এটি সুরার সর্বশেষ আয়াত, এর পরে আর কোনো আয়াত নেই; বরং এর ক্রমধারা গিয়ে মিশেছে পরবর্তী সুরা নাস-এর সঙ্গে, যা আশ্রয়প্রার্থনার পূর্ণতা-দুই মুআওয়িযাতাইন একত্রে এগারোটি আয়াত, ফালাক পাঁচ ও নাস ছয় ।
সুরা ফালাকে আশ্রয়ের পরিধি ক্রমে সংকীর্ণ ও গভীর হয়ে এসেছে-প্রথমে সমস্ত সৃষ্টির অনিষ্ট, তারপর আঁধার রাত, তারপর গ্রন্থিতে ফুঁ দেওয়া জাদুকারিনীরা, আর সবশেষে এসে থামল সেই উৎসে, যেখান থেকে এসব অনিষ্ট জন্ম নেয়: হিংসুকের হিংসা। হাসাদ মানে অন্যের ভালো দেখে ভেতরে জ্বলে ওঠা ও সেই ভালোটুকু মুছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা [১][২]। কুরআন এখানে দুটি সূক্ষ্ম শর্ত রেখেছে। এক, সব হিংসা সমান নয়-তাই ‘হিংসুক’ শব্দটি অনির্দিষ্ট, কারণ কল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাময় আকাঙ্ক্ষা নিন্দনীয় হিংসা নয় [১][৬][৭]। দুই, ‘যখন সে হিংসা করে’-অর্থাৎ যতক্ষণ হিংসা বুকের ভেতরে চাপা থাকে, ততক্ষণ সে কেবল নিজেকেই পোড়ায়, অন্যের সুখে নিজেই অসুখী হয়; ক্ষতি শুরু হয় তখনই, যখন সে তা প্রকাশ করে, বদনজরে কিংবা চক্রান্তে তার দাবি অনুযায়ী কাজ করে [৬][৭]। এই হিংসাই ছিল ইতিহাসের প্রথম পাপ-আকাশে ইবলীসের, পৃথিবীতে আদমপুত্রের [১]; আর এই হিংসা থেকেই নবীজির ওপর সেই জাদু করা হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে আগের আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হলো [৪][৭]। তাই হিংসুকের কথা আলাদা করে শেষে আনা-কাকতালীয় নয়; কারণ জাদুসহ মানুষের প্রতি অধিকাংশ পীড়নের শিকড়ই হিংসা [৭]। অন্য অনিষ্ট চোখে পড়ে, ঠেকানো যায়; কিন্তু হিংসা গুপ্ত, নিঃশব্দে, অজান্তে আঘাত হানে-তাই এর বিরুদ্ধে রক্ষা চাইতে হয় কেবল ফালাকের রবের কাছেই [৬].
ধরুন, পাশের বাড়ির কেউ একটা সুন্দর জিনিস পেল-ভালো ফসল, সুস্থ সন্তান, সম্মান। আরেকজন তা দেখে খুশি না হয়ে ভেতরে জ্বলতে থাকল, মনে মনে চাইল জিনিসটা নষ্ট হয়ে যাক। এটাই হাসাদ (حسد): অন্যের নেয়ামত দেখে দগ্ধ হওয়া ও তার ধ্বংস কামনা করা । আয়াত বলছে, এই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে রবের আশ্রয় চাও-বিশেষত ‘যখন সে হিংসা করে’, অর্থাৎ মনের আগুন নেভাতে কথায়-কাজে বা বদনজরে কিছু করে বসে । চোখে দেখা যায় না বলেই এই বিপদ আরও ভয়ংকর; তাই আলাদা করে এর উল্লেখ ।
না, সব হিংসা নিন্দনীয় নয়-আর এ কারণেই আয়াতে حاسد শব্দটি নকিরাহ বা অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে । যামাখশারী বলেন, প্রত্যেক হিংসুক ক্ষতি করে না; কল্যাণের ক্ষেত্রে এক প্রশংসিত আকাঙ্ক্ষা আছে, যাকে গিবতাহ বলা যায়-অন্যের মতো ভালো পাওয়ার চাওয়া, অন্যেরটা নষ্ট হওয়ার চাওয়া নয় । আবু বকর যাকারিয়াও স্পষ্ট করেছেন, কেউ যদি চায় তাকেও তেমন অনুগ্রহ দেওয়া হোক, তবে তা হাসাদের সংজ্ঞায় পড়ে না । তাই অনির্দিষ্ট শব্দটি ইঙ্গিত করে-আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে কেবল সেই নিন্দিত হিংসা থেকে, যা অন্যের নেয়ামতের অবসান চায় ।
এই শর্তেই আয়াতের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা লুকিয়ে। মোফাসসিরগণ বলেন, যতক্ষণ হিংসা মনের ভেতরে চাপা থাকে, ততক্ষণ তা দিয়ে কেবল হিংসুক নিজেই কষ্ট পায়-অন্যের সুখে সে নিজেই অসুখী হয়, ক্ষতি হয় তার নিজেরই । অন্যের ক্ষতি শুরু হয় তখনই, যখন সে হিংসা প্রকাশ করে এবং তার দাবি অনুযায়ী কাজে নামে-বদনজর, ষড়যন্ত্র বা জাদুর মতো । তাই ‘إذا حَسَدَ’ যোগ করে অনিষ্টকে সেই মুহূর্তে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে যখন তা কার্যে রূপ নেয় । যামাখশারী উমর ইবন আবদুল আযীযের কথা উদ্ধৃত করেছেন: ‘হিংসুকের চেয়ে মজলুমসদৃশ জালিম আমি দেখিনি’-কারণ সে নিজের আগুনে নিজেই পোড়ে ।
কারণ হিংসাই সব অনিষ্টের শিকড়। আল-বিকাঈ দেখান, জাদুসহ মানুষের প্রতি অধিকাংশ পীড়নের সবচেয়ে বড় প্রেরণাই হলো হাসাদ, তাই আগের আয়াতের জাদুকারিনীদের পর স্বাভাবিকভাবেই হিংসুকের কথা এসেছে । এর মাধ্যমে সুরার শেষ তার শুরুর দিকে ফিরে গেছে: সূচনায় ছিল সাধারণ ‘সৃষ্টির অনিষ্ট’, আর শেষে এসে তা পরিণতি পেয়েছে সবচেয়ে গূঢ় ও সর্বনাশা অনিষ্টে । মোফাসসিরগণ আরও স্মরণ করান, এই হিংসাই আকাশে প্রথম গুনাহ (ইবলীস) ও পৃথিবীতে প্রথম গুনাহ (আদমপুত্র) , এবং এই হিংসা থেকেই নবীজির ওপর জাদু হয়েছিল -তাই শেষে এর উল্লেখ একান্ত যথাযথ।
এটি এক অলংকারিক প্রশ্ন, যা যামাখশারী নিজেই তুলে নিজেই জবাব দিয়েছেন। প্রথম আয়াতের ‘مِن شَرِّ ما خَلَقَ’ আসলে সব অনিষ্টকেই ঢেকে ফেলে । তবু এই তিনটি-আঁধার রাত, ফুঁৎকারিনী জাদুকারিনী ও হিংসুক-বিশেষভাবে উল্লিখিত, কারণ এদের অনিষ্ট গোপন ও লুকানো; মানুষ জানতেও পারে না কোথা থেকে আঘাত এল, যেন গুপ্তঘাতক অসতর্ক মুহূর্তে আঘাত হানল । আরবরা বলত: সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সেই, যে এমন দিক থেকে ছল করে যা তুমি টেরও পাও না । তাই সাধারণের ভেতর থেকে এই বিশেষ অদৃশ্য বিপদগুলোকে আলাদা করে আশ্রয়ের আবেদনে আনা হয়েছে।
মোফাসসিরদের মাঝে এ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আহলে সুন্নাহর অভিমত-কিতাব ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল অনুযায়ী জাদু বাস্তব এবং তার প্রভাব আছে; নবীজির ওপর জাদুর ঘটনাই তার প্রমাণ । ইবন কাসীর বুখারি-মুসলিমের বরাতে সবিস্তারে সেই ঘটনা এনেছেন-কীভাবে গ্রন্থিতে জাদু করা হয় ও দুই সুরা পাঠে তা খুলে যায় । অন্যদিকে যামাখশারী মুতাযিলি মতে ঝুঁকে জাদুর প্রকৃত প্রভাব অস্বীকারের প্রবণতা দেখান, যা টীকাকার ইবন মুনীর সংশোধন করে আহলে সুন্নাহর অবস্থান তুলে ধরেন । মূল কথা-আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না; তাই রক্ষা একমাত্র ফালাকের রবের কাছেই ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
অডিও: EveryAyah.com - মিশারি রাশিদ আল-আফাসী (সুন্দর তিলাওয়াত), মাহমুদ খলিল আল-হুসারী মুআল্লিম (তাজবীদ শিক্ষা)