The Sincerity · 4 আয়াত · মাক্কী
সব আয়াত প্রস্তুত, যাচাইের অপেক্ষায়
সূরা ইখলাসের সূচনা আয়াত قُلۡ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ। মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর প্রতিপালকের পরিচয় ও বংশসূত্র জিজ্ঞেস করল - তিনি কিসের তৈরি, স্বর্ণের না রৌপ্যের - তখন এর জবাবে এ সূরা নাযিল হয় । ‘বলুন’ (قُل) শব্দ দিয়ে প্রথমে নবীকে সম্বোধন করা হয়েছে, কেননা প্রশ্নটি তাঁকেই করা হয়েছিল; কিন্তু পরে তা প্রত্যেক মুমিনের প্রতিও সম্প্রসারিত - যে কথা নবীকে বলতে আদেশ করা হয়েছিল, এখন তা প্রত্যেক মুমিনকেও বলতে হবে । মুখতাসারে এসেছে, আল্লাহ উলূহিয়্যাতে (الألوهية) একক, তিনি ছাড়া কোনো হক মাবুদ নেই । ‘আহাদ’ (أَحَد) শব্দটি একমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য, কারণ গুণ ও কর্মে তিনিই একমাত্র পরিপূর্ণ সত্তা - তাঁর কোনো সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান বা অংশীদার নেই । ইবনে কাসীর বলেন, ‘আহাদ’ অর্থ যিনি সৃষ্ট নন এবং যাঁর সন্তান নেই; সৃষ্ট সত্তা একদিন মরে এবং তার উত্তরাধিকারী হয়, কিন্তু আল্লাহ অবিনশ্বর, তাঁর কোনো উত্তরাধিকারীও নেই । যামাখশারী ও বিকাঈ ব্যাকরণগত দিক বিশ্লেষণ করে দেখান, ‘আল্লাহ’ হলো ‘হুয়া’র খবর এবং ‘আহাদ’ তার বদল বা দ্বিতীয় খবর । বিকাঈ আরও বলেন, ইলাহিয়্যাত একত্বকে আবশ্যক করে - যিনি সকল কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী এবং যাঁর প্রতি সকলে মুখাপেক্ষী, তিনি অবশ্যই পরম এক ।
একাধিক বর্ণনায় এসেছে, মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিল, ‘হে মুহাম্মদ, আপনি যে রবের দিকে আমাদের ডাকছেন তাঁর বংশপরিচয় ও গুণাবলী আমাদের কাছে বর্ণনা করুন।’ কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, তারা প্রশ্ন করেছিল আল্লাহ কিসের তৈরি - স্বর্ণের, রৌপ্যের, নাকি অন্য কিছুর। এর জবাবেই এ সূরা অবতীর্ণ হয় । ইকরিমা থেকে বর্ণিত আছে, ইহুদিরা উযায়েরকে, খ্রিস্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলত, মাজুসীরা চন্দ্র-সূর্যের ও মুশরিকরা মূর্তির উপাসনা করত - সব ভ্রান্তির জবাবেই এ সূরা নাযিল হয় ।
ব্যাকরণ ও অলংকারের সূক্ষ্মতা সূত্রগুলোতে বিস্তৃতভাবে এসেছে। ‘হুয়া’ (هو) হলো দামীরুশ-শা’ন (ضمير الشأن) - অর্থাৎ এমন এক সর্বনাম যা পুরো বাক্যের গুরুত্ব আগেভাগে ঘোষণা করে দেয়, যেন বলা হলো ‘ব্যাপারটি এই যে, আল্লাহ এক’ । আবার ‘হুয়া’কে মুবতাদা ধরলে ‘আল্লাহ’ তার খবর এবং ‘আহাদ’ বদল বা দ্বিতীয় খবর । ‘আহাদ’ ও ‘ওয়াহিদ’-এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে: ‘আহাদ’ এমন একত্ব বোঝায় যাতে কোনো প্রকার সংখ্যা, বিভাজন বা যৌগিকতার লেশমাত্র নেই, আর এটি একমাত্র আল্লাহর জন্যই খাস - ‘যায়েদ আহাদ’ বলা যায় না । যামাখশারী বিস্ময় প্রকাশ করেন কেন এত ছোট সূরা সমগ্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমকক্ষ - কারণ এতে রয়েছে আল্লাহর সত্তা, গুণ ও তাওহীদের সারকথা ।
এ আয়াতের পূর্বে কোনো আয়াত নেই, এটিই সূরার সূচনা। তবে সূরার অভ্যন্তরীণ সংগতিতে এ আয়াত পরবর্তী আয়াত اَللّٰهُ الصَّمَدُ-এর ভিত্তি স্থাপন করে: আহাদিয়্যাত (একত্ব) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সামাদিয়্যাত (অমুখাপেক্ষিতা) আসে - যিনি গুণ-কর্মে একক, তিনিই সেই সত্তা যাঁর প্রতি সমস্ত সৃষ্টি মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন । বিকাঈ সূরাগুলোর পারস্পরিক সংগতি দেখিয়ে বলেন, সূরা আন-নাসর ও সূরা লাহাবে আল্লাহ তাঁর শত্রুর ধ্বংস ও বন্ধুর বিজয় দেখানোর পর শ্রোতার অন্তরে এমন এক মহান কর্তার পরিচয় জানার আকুলতা জাগে যিনি এসব করতে সক্ষম - তাই সূরা ইখলাস এসে সেই মহিমান্বিত সত্তার পরিচয় উন্মোচন করে । বিকাঈ এ-ও বলেন, ‘আহাদ’ দিয়ে শুরু করে নয়, বরং আগে ইলাহিয়্যাত ও পরে আহাদিয়্যাত আনা হয়েছে, কারণ ইলাহ হওয়া একত্বকে অপরিহার্য করে তোলে - একত্ব ইলাহ হওয়াকে নয় ।
কল্পনা করুন এক জনপদে নানা মুখের নানা দাবি - কেউ চাঁদ-সূর্যের পূজা করে, কেউ পাথরের মূর্তিকে প্রভু মানে, কেউ আল্লাহর নামে সন্তান কল্পনা করে। এমন কোলাহলের মাঝে কেউ এসে নবীকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার রব কে, তিনি কেমন, কিসের তৈরি?’ তখন আকাশ থেকে নেমে এল ছোট্ট অথচ মহাসমুদ্রসম এক বাক্য: ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক’ [১][৪][৬]। এই ‘বলুন’ শব্দটি কেবল নবীর জন্য থেমে থাকেনি; নবীর পরে তা প্রতিটি মুমিনের জিহ্বায় স্থানান্তরিত হয়েছে - যে উত্তর সেদিন নবীকে দিতে বলা হয়েছিল, আজ তা আমাদের প্রত্যেকেরই ভাষা [১]। আর ‘আহাদ’ - এমন এক শব্দ যা আল্লাহ ছাড়া আর কারও গায়ে মানায় না, কারণ তিনিই কেবল গুণে-কর্মে পরিপূর্ণরূপে এক [১][৪]। ইবনে কাসীর সূক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দেন একত্বের অর্থ: যা সৃষ্ট, তা একদিন মরে, তার অংশ হয়, উত্তরাধিকারী হয়; কিন্তু আল্লাহ সৃষ্ট নন, তাঁর জন্ম-মৃত্যু নেই, ভাগ নেই, সমকক্ষ নেই [৪]। বিকাঈর ভাষায় এই একত্ব এমন বিশুদ্ধ যে তাতে সংখ্যার ছায়াও পড়ে না - ‘আহাদ’ সেই সত্তা যাঁর বাইরে কিছু অবশিষ্ট নেই যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে [৭]। আর এই একত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ামাত্রই পরের আয়াত স্বাভাবিকভাবে ফুটে ওঠে - ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী’ - কারণ যিনি সত্যিকারের এক, সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারও নন [৪][৬]।
ভাবুন, কেউ কারও পরিচয় জানতে চাইলে আমরা বলি বাবার নাম, বংশ, কে কিসের তৈরি। মক্কার মুশরিকরা ঠিক এভাবেই নবীর কাছে আল্লাহর বংশ ও গঠন জানতে চাইল - তিনি কি স্বর্ণের, না রৌপ্যের ? জবাবে এল এক বিস্ময়কর উত্তর: তিনি কারও মতো নন, তিনি কেবলই ‘এক’ - যাঁর জন্ম নেই, অংশ নেই, সমকক্ষ নেই । যেন প্রশ্নকর্তার গোটা প্রশ্নের কাঠামোটাই ভেঙে দেওয়া হলো - আল্লাহ এমন সত্তা নন যাঁকে উপাদান বা বংশ দিয়ে মাপা যায় ।
প্রথমত ‘বলুন’ দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই সম্বোধন করা হয়েছে, কেননা প্রশ্নটি তাঁকেই করা হয়েছিল - ‘আপনার রব কে, তিনি কেমন’ - আর তাঁকেই আদেশ দেওয়া হয়েছিল এ জবাব দিতে । কিন্তু নবীর তিরোধানের পর এ সম্বোধন প্রত্যেক মুমিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়; যে কথা নবীকে বলতে আদেশ করা হয়েছিল, এখন তা প্রতিটি মুমিনকেই বলতে হবে । বিকাঈ যোগ করেন, ‘বলুন’ কোনো নির্দিষ্ট শ্রোতার সঙ্গে আবদ্ধ না রেখে অবাধে রাখা হয়েছে, যাতে রিসালাতের সর্বজনীনতা বোঝা যায় - যাকেই কথা বলা সম্ভব, তার সবার প্রতিই এ আদেশ ।
সূত্রগুলো দেখায় ‘আহাদ’ (أحد) এমন এক বিশেষ একত্ব বোঝায় যাতে সংখ্যা, বিভাজন বা যৌগিকতার কোনো অবকাশ নেই, এবং তা একমাত্র আল্লাহর জন্যই খাস - তাই ‘যায়েদ আহাদ’ বলা যায় না । আরবিতে ‘আহাদ’ সাধারণত নেতিবাচক বাক্যে ব্যবহৃত হয়, যেমন ‘ঘরে কেউ (আহাদ) নেই’, যা সব ধরনের সংখ্যাকে একসঙ্গে অস্বীকার করে । ‘ওয়াহিদ’ সংখ্যার সূচনা, তার সঙ্গে দুই-তিন যোগ হতে পারে; কিন্তু ‘আহাদ’ এমন পরিপূর্ণ একত্ব যা গুণ-কর্ম-সত্তা সব দিক থেকে একক । তাই আল্লাহর জন্য এ শব্দই সবচেয়ে যথার্থ ।
কেবল সংখ্যা নয়। সূত্রগুলোর মতে এই একত্ব সত্তা, গুণ ও কর্ম - সব দিক থেকে । আল্লাহর কোনো সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান বা অংশীদার নেই; পূর্ণতা, সুন্দর নামসমূহ ও শ্রেষ্ঠ গুণাবলী এককভাবে কেবল তাঁরই । ইবনে কাসীর বলেন, তিনি সৃষ্ট নন বলেই তাঁর জন্ম, মৃত্যু বা উত্তরাধিকারী নেই । বিকাঈ এ একত্বকে এমন বিশুদ্ধ বলেন যে তাতে কোনো যৌগিকতা বা দ্বিত্বের ছায়া পড়ে না - তিনি নিজ সত্তায় এক, অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল নন । সমগ্র কুরআন ও সকল নবীর আগমন এ একত্ব ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠার জন্যই ।
যামাখশারী এ প্রশ্ন নিজেই তোলেন এবং উত্তর দেন: ছোট হলেও এতে আছে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, তাঁর ন্যায় ও তাওহীদের সারকথা । তাফসীর আবু বকর যাকারিয়ায় হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য বলেছেন এবং এর প্রতি ভালোবাসা জান্নাতে প্রবেশের কারণ । ইবনে কাসীরে এমন বহু বর্ণনা এসেছে - কেউ প্রতি রাকাতে এ সূরা পড়তেন বলে নবী জানালেন আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন । জ্ঞান তার বিষয়ের মর্যাদায় মর্যাদাবান হয়, আর এ সূরার বিষয় স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলী - তাই এর শ্রেষ্ঠত্ব ।
ইবনে কাসীরে ইকরিমা থেকে বর্ণিত, এ সূরা একসঙ্গে বহু ভ্রান্তির জবাব - ইহুদিরা উযায়েরকে, খ্রিস্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলত, মাজুসীরা চন্দ্র-সূর্যের ও মুশরিকরা মূর্তির উপাসনা করত । বিকাঈ বিস্তারিতভাবে দেখান, ‘আহাদ’ একসঙ্গে খণ্ডন করে খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (পিতা-পুত্র-পবিত্র আত্মা), ইহুদিদের আল্লাহকে দেহধারী ভাবা, মাজুসীদের দ্বৈতবাদ (আলো ও অন্ধকারের দুই স্রষ্টা), সাবিঈদের নক্ষত্রপূজা এবং মুশরিকদের মূর্তিপূজা । এক ‘আহাদ’ শব্দেই সকল প্রকার শিরক ও বহুত্ববাদের মূল কেটে দেওয়া হয়েছে ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
এই আয়াতে আল্লাহ নিজের পরিচয় দিচ্ছেন এক মহিমান্বিত নামে-সামাদ (الصمد)। তাফসিরবিদগণ এই শব্দের অর্থে দুটি প্রধান ধারা তুলে ধরেছেন। প্রথমত, সামাদ সেই সত্তা যাঁর কাছে সমস্ত সৃষ্টি তাদের প্রয়োজনে আশ্রয় নেয়; তিনিই অভীষ্ট, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী আর তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন । জালালাইন সংক্ষেপে বলেন-তিনিই চিরকাল সব প্রয়োজনে অভীষ্ট সত্তা । দ্বিতীয়ত, ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত যে সামাদ সেই নেতা ও সরদার, যাঁর নেতৃত্ব, মর্যাদা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সহিষ্ণুতা পূর্ণতার চরমে পৌঁছেছে । আরও অর্থ এসেছে-যিনি সৃষ্টি ধ্বংস হলেও অবশিষ্ট থাকেন, চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক; যাঁর উদর নেই, যিনি পানাহার করেন না, যাঁর ভেতরে শূন্যতা নেই । আবু বকর যাকারিয়া বলেন, এই সব অর্থই সঠিক, কারণ আসল ও প্রকৃত সামাদ একমাত্র আল্লাহ; সৃষ্টি কোনো দিক দিয়ে আপেক্ষিকভাবে এসব গুণের অধিকারী হলেও আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ । যামাখশারী যোগ করেন, সামাদ গঠিত হয়েছে ‘সামাদা ইলাইহি’ (صمد إليه) থেকে, অর্থাৎ কেউ যখন কারও দিকে অভিপ্রায় করে; তাই তিনি সেই সরদার যাঁর দিকে সব প্রয়োজনে অভিমুখ হওয়া হয় । এই নামটিই তাঁর একত্ব, এক মাবুদ হওয়া ও ইবাদতের একমাত্র যোগ্যতার দাবিকে অনিবার্য করে তোলে ।
এই সূরার শানে নুযূল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে-মুশরিকরা বা কুরাইশরা নবী (সা.)-কে বলেছিল, ‘আপনার প্রতিপালকের গুণাবলি আমাদের সামনে বর্ণনা করুন’; তখন এই সূরা নাজিল হয় । অন্য বর্ণনায় ইহুদিরা উযায়রকে, খ্রিস্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র দাবি করত এবং মুশরিকরা মূর্তিপূজা করত-এই পটভূমিতে সূরাটি অবতীর্ণ হয় ।
যামাখশারী লক্ষ করেন, ‘আল্লাহু আস-সামাদু’ একটি মুবতাদা ও খবরের গঠন, যেখানে আল্লাহ নামটি পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে-সর্বনাম দিয়ে নয় । আল-বিকাঈ এই পুনরাবৃত্তির রহস্য খোলেন-সর্বনাম ব্যবহার করলে যদি কেউ গায়েবের কোনো সীমাবদ্ধতা কল্পনা করে, সেই আশঙ্কা দূর করতেই নামটি আবার আনা হলো; আর বাক্যটি ওয়াও সংযোজক ছাড়া রাখা হয়েছে, কারণ এটি যেন আগের আয়াতের ফলাফল ও তার প্রমাণস্বরূপ । সামাদ শব্দটি ‘ফাআল’ ওজনে ‘মাফউল’ অর্থে গঠিত, অর্থাৎ যাঁর দিকে অভিমুখ হওয়া হয় ।
আল-বিকাঈ দেখান যে প্রথম আয়াতে ‘আহাদ’ (أحد) দিয়ে আল্লাহর একত্ব-বিভাজন ও সমকক্ষ থেকে পবিত্রতা-ঘোষিত হলো, আর এই দ্বিতীয় আয়াত যেন তারই ফলাফল ও দলিল; তাই দুই বাক্যের মাঝে কোনো সংযোজক রাখা হয়নি । আহাদ যদি সমকক্ষহীন একত্বের ঘোষণা হয়, তবে সামাদ সেই একত্বেরই বাস্তব রূপ-কারণ যিনি সকলের অমুখাপেক্ষী আর সকলে যাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি অনিবার্যভাবে একক ও স্বজনহীন । আর পরের আয়াত ‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ’ যেন এই সামাদ-গুণেরই ব্যাখ্যা; যামাখশারী ও ইবন কাসীর বলেন, যিনি জন্ম দেননি ও জন্মগ্রহণ করেননি-এটিই প্রমাণ করে তাঁর অমুখাপেক্ষিতা ও চিরন্তনতা, কারণ যে জন্ম নেয় সে সৃষ্ট ও নশ্বর ।
আগের আয়াতে নবীকে বলা হয়েছিল ঘোষণা করতে-তিনি আল্লাহ, এক। সেই একত্বের কথা যেন এই আয়াতে আরও গভীরে নেমে আসে একটি নামে: আস-সামাদ। শব্দটির ভেতরে দুটি ছবি একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। একদিকে তিনি সেই আশ্রয়, যাঁর দিকে গোটা সৃষ্টি-জানা হোক বা না-জানা-নিজের প্রতিটি প্রয়োজনে মুখ ফেরায়; পিপাসার্ত যেমন পানির দিকে ছোটে, তেমনি প্রতিটি অস্তিত্ব নিজের টিকে থাকা ও অভাব পূরণের জন্য তাঁরই কাছে হাত পাতে, আর তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না [১][২][৪]। অন্যদিকে তিনি সেই সরদার, যাঁর নেতৃত্ব ও মর্যাদা পূর্ণতার শেষ সীমায় পৌঁছেছে, যাঁর জ্ঞান-প্রজ্ঞা-সহিষ্ণুতার ওপরে আর কিছু নেই [৪][৭]। কেউ বলেছেন, তিনি সেই সত্তা যাঁর ভেতরে কোনো শূন্যতা নেই, যিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী নন, সৃষ্টি মুছে গেলেও যিনি অবশিষ্ট থাকেন [১][৪]। আবু বকর যাকারিয়া সুন্দরভাবে মিলিয়ে দেন-এসব অর্থই সত্য, কারণ সৃষ্টি কোনো দিক দিয়ে আপেক্ষিকভাবে এসব গুণ পেলেও পরম ও সর্বদিক-পূর্ণ সামাদ একমাত্র আল্লাহ; আর এই অমুখাপেক্ষিতা থেকেই অনিবার্যভাবে আসে তাঁর একত্ব ও একমাত্র মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা [১]। আর তাই পরের আয়াতে যখন বলা হয় তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি-সেটি যেন এই সামাদ-গুণেরই স্বাভাবিক পরিণতি; যিনি অমুখাপেক্ষী ও চিরন্তন, তাঁর তো সন্তানেরও প্রয়োজন নেই, পিতারও নয় [৪][৬]।
কল্পনা করুন এক গভীর রাতে গোটা গ্রাম পিপাসার্ত; সবাই ছুটে যাচ্ছে একটিমাত্র অফুরান ঝরনার দিকে, অথচ ঝরনাটির নিজের কারও কাছ থেকে কিছু নেওয়ার নেই। সামাদ (الصمد) ঠিক তেমনই-সেই সত্তা যাঁর কাছে সব সৃষ্টি নিজের প্রয়োজনে আশ্রয় নেয়, আর তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন । তাফসিরবিদ আলী ও ইকরিমা বলেন, তিনিই সেই সত্তা যাঁর কাছে সবাই প্রয়োজন পূরণের জন্য হাজির হয় । মুখতাসারে এসেছে, গোটা সৃষ্টিজীব তাঁরই মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারও নন । অর্থাৎ অভাব মানুষের দিকে, পূর্ণতা একমাত্র তাঁর দিকে।
মূলত শব্দটির ভাষাগত গভীরতাই এর কারণ। যামাখশারী ও আল-বিকাঈ দেখান, সামাদ এসেছে ‘সামাদা ইলাইহি’ (صمد إليه) থেকে, যার অর্থ কারও দিকে অভিপ্রায় করা-তাই এটি সেই সরদার যাঁর দিকে অভিমুখ হওয়া হয় । আবার ‘সামাদ’ মানে নিরেট-কঠিন, যার ভেতরে শূন্যতা নেই; এ থেকে অর্থ এসেছে-যাঁর উদর নেই, যিনি পানাহারের মুখাপেক্ষী নন । আবু বকর যাকারিয়া মীমাংসা টানেন-এই সব অর্থই নির্ভুল, কারণ প্রকৃত ও পূর্ণ সামাদ একমাত্র আল্লাহ, যাঁর প্রতিটি অর্থই তাঁর মধ্যে পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান ।
আল-বিকাঈ এর সূক্ষ্ম সমন্বয় তুলে ধরেন। আহাদ (أحد) হলো একত্বের ঘোষণা-বিভাজন ও সমকক্ষ থেকে পবিত্রতা; আর সামাদ যেন সেই একত্বের জীবন্ত প্রমাণ ও ফলাফল, তাই দুই বাক্যের মাঝে কোনো সংযোজক রাখা হয়নি । আবু বকর যাকারিয়াও বলেন, যিনি সামাদ তাঁর একক হওয়া অনিবার্য, কারণ একাধিক সত্তা একসঙ্গে সবার অমুখাপেক্ষী ও সবার প্রয়োজন পূরণকারী হতে পারে না । সুতরাং আহাদ যা ঘোষণা করল, সামাদ তা প্রমাণ করল।
হ্যাঁ, আবু বকর যাকারিয়া এটি স্পষ্ট করেন। মানুষ স্বভাবতই তারই ইবাদত করে যার কাছে সে নিজের প্রয়োজনে হাত পাতে; আর যার প্রয়োজন পূরণের সামর্থ্যই নেই, কোনো সচেতন মানুষ তার ইবাদত করতে পারে না । যেহেতু একমাত্র আল্লাহই সামাদ-সবার অভাব পূরণকারী ও কারও অমুখাপেক্ষী-তাই একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য । আল-বিকাঈও বলেন, সবার পরম মুখাপেক্ষিতা ও তাঁর পরম অমুখাপেক্ষিতা এটাই দাবি করে যে একমাত্র তিনিই ইবাদতের অধিকারী, তাঁর কোনো শরিক নেই ।
আবু বকর যাকারিয়া এর সুন্দর জবাব দেন। সৃষ্টি যদি কোনো এক দিক দিয়ে সামাদ হয়েও থাকে, অন্য দিক দিয়ে তা সামাদ নয়-কারণ সে অবিনশ্বর নয়, একদিন তার বিনাশ হবে । কোনো নেতার নেতৃত্ব আপেক্ষিক, নিরঙ্কুশ নয়; কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেও তার চেয়েও শ্রেষ্ঠ আরেকজন থেকে যায়; কেউ কারও কিছু প্রয়োজন মেটালেও সবার সব প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য কারও নেই । তাই পরম ও সর্বদিক-পূর্ণ সামাদ একমাত্র আল্লাহ-তিনি রিজিক দেন, নেন না; চিরন্তন, অজেয়, অক্ষয় ।
ইবন কাসীর ও যামাখশারী এই যোগসূত্র খোলেন। যে জন্মগ্রহণ করে, সে সৃষ্ট, দেহধারী ও নশ্বর; অথচ আল্লাহ চিরন্তন, যাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই । আর জন্ম দেওয়ার জন্য সমজাতীয় সঙ্গিনী প্রয়োজন, যা থেকে তিনি পবিত্র । ইকরিমা থেকে বর্ণিত সামাদের একটি অর্থই হলো-যাঁর থেকে কিছু বের হয় না, অর্থাৎ যিনি কাউকে জন্ম দেন না । তাই পরের আয়াত যেন এই সামাদ-গুণেরই ব্যাখ্যা-অমুখাপেক্ষী ও চিরন্তন সত্তার সন্তানেরও প্রয়োজন নেই, পিতারও নয় ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
আগের আয়াতে আল্লাহকে ‘সামাদ’ বলার পর এখানে সেই অমুখাপেক্ষিতারই অনিবার্য দাবি ফুটে ওঠে, لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُوۡلَدۡ, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি । যারা আল্লাহর বংশপরিচয় জানতে চেয়েছিল, এ যেন তাদেরই জবাব; কেননা সন্তান জন্ম দেওয়া সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য, স্রষ্টার নয় । তাই তিনি কারও সন্তান নন, আর তাঁরও কোনো সন্তান নেই । ইবনে কাসীর সূক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দেন, ‘লাম ইউলাদ’ অর্থ যিনি সৃষ্ট নন; কারণ যা সৃষ্ট হয় তা একদিন মরে এবং অন্যেরা তার উত্তরাধিকারী হয়, কিন্তু আল্লাহ অবিনশ্বর, তাঁর কোনো উত্তরাধিকারীও নেই । এই এক বাক্যে একদিকে খণ্ডিত হয় ইহুদি-খ্রিস্টানদের ‘আল্লাহর পুত্র’ দাবি, অন্যদিকে অস্বীকৃত হয় তাঁর কোনো উৎস বা জনক থাকার কল্পনা ।
মুশরিকরা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আল্লাহর বংশ ও পরিচয় জানতে চেয়েছিল, তখন গোটা সূরার সঙ্গে এ আয়াতও সেই প্রশ্নের জবাবে নাযিল হয় । পাশাপাশি এটি ইহুদিদের উযায়ের ও খ্রিস্টানদের ঈসাকে ‘আল্লাহর পুত্র’ বলার ভ্রান্তিরও জবাব ।
দুই দিক থেকে অস্বীকৃতির ভঙ্গিতেই অলংকার। জালালাইন দেখান, ‘লাম ইয়ালিদ’ (জন্ম দেননি) এসেছে তাঁর সমজাতীয় কিছু থাকার অস্বীকৃতিতে, আর ‘লাম ইউলাদ’ (জন্ম নেননি) এসেছে তাঁর সূচনা বা আদিযুক্ততার অস্বীকৃতিতে । অর্থাৎ একটি বাক্যেই ঊর্ধ্ব ও অধঃ, উভয় দিকের সম্পর্ক কেটে দেওয়া হয়েছে; না তাঁর কোনো শাখা আছে, না কোনো মূল ।
আগের আয়াতে ‘সামাদ’ বলে জানানো হয়েছিল আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী; এ আয়াত সেই অমুখাপেক্ষিতাকেই দৃঢ় করে, কারণ সন্তান বা জনক থাকা মানেই অভাব, ভাগ ও বিনশ্বরতা, যা সামাদের সঙ্গে যায় না । আর পরের আয়াত وَلَمۡ يَكُنۡ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ এসে এই অস্বীকৃতিকে পূর্ণতা দেয়, কেবল সন্তান-জনক নয়, কোনো সমকক্ষও তাঁর নেই । ফলে ‘আহাদ → সামাদ → জন্মহীনতা → সমকক্ষহীনতা’, এই ধারায় সমস্ত প্রকার অংশীদারিত্বের শিকড় কেটে যায় ।
ভাবুন, কেউ আল্লাহর বংশ-পরিচয় জানতে চাইছে, যেমন মানুষের বাবা-দাদা থাকে। উত্তরে এল, তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। সন্তান হওয়া তো সৃষ্টির ধর্ম, যে জন্মায় সে বাড়ে, বুড়ো হয়, মরে, আর রেখে যায় উত্তরাধিকারী; কিন্তু আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর শুরুও নেই, শেষও নেই [১][৪]। আগের আয়াতের ‘সামাদ’ যে অমুখাপেক্ষী সত্তার কথা বলেছিল, এ আয়াত তারই স্বাভাবিক পরিণতি, কারণ যাঁর সন্তান বা জনক থাকে তাঁর অভাব ও নির্ভরতা থাকে; আর পরের আয়াত মিলিয়ে দাঁড়ায় পূর্ণ ঘোষণা, তাঁর সন্তান নেই, জনক নেই, সমকক্ষও নেই, তিনি প্রকৃত অর্থেই এক [৩][৪]।
মানুষের পরিচয় জানতে আমরা বাবা-দাদার নাম জিজ্ঞেস করি। মক্কার মুশরিকরাও নবীর কাছে আল্লাহর তেমন বংশ-পরিচয় চেয়েছিল । জবাবে এল এক চমকপ্রদ উত্তর, তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি । অর্থাৎ প্রশ্নের কাঠামোটাই খাটে না; জন্ম-জন্মান্তর তো সৃষ্টির গল্প, স্রষ্টার নয়। যিনি সবকিছুর উৎস, তাঁর নিজের কোনো উৎস থাকতে পারে না, আর যিনি চিরস্থায়ী, তাঁর কোনো উত্তরসূরিরও দরকার নেই ।
কারণ সম্পর্কের দুটি দিকই বন্ধ করা উদ্দেশ্য। ‘জন্ম দেননি’ অস্বীকার করে তাঁর কোনো সন্তান বা শাখা থাকার কল্পনা, আর ‘জন্ম নেননি’ অস্বীকার করে তাঁর কোনো জনক বা উৎস থাকার ধারণা । জালালাইনের ভাষায়, প্রথমটি তাঁর সমজাতীয় কিছু থাকার অস্বীকৃতি, দ্বিতীয়টি তাঁর আদিযুক্ত বা সৃষ্ট হওয়ার অস্বীকৃতি । দুই অস্বীকৃতি মিলে আল্লাহকে সব ধরনের বংশ-শৃঙ্খল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত প্রমাণ করে ।
এটি সরাসরি খণ্ডন করে ‘আল্লাহর সন্তান আছে’ এই ধরনের সব দাবি, যেমন ইহুদিদের উযায়েরকে ও খ্রিস্টানদের ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলা । যাকারিয়ায় এসেছে, এটি মূলত সেই মুশরিকদের জবাব যারা আল্লাহর বংশপরিচয় জানতে চেয়েছিল । সন্তান-জনকের ধারণা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য; স্রষ্টার সঙ্গে তা জুড়ে দেওয়া তাঁর মহিমার পরিপন্থী, তাই কুরআন এক বাক্যেই এ ভ্রান্তি উপড়ে ফেলে ।
কারণ জন্মদান অভাব ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে জড়িত। যে সন্তান চায়, সে নিজের অসম্পূর্ণতা পূরণ করতে বা বংশ টিকিয়ে রাখতে চায়; আর যে জন্মায়, সে একসময় মরে ও উত্তরসূরি রেখে যায় । আল্লাহ এসব থেকে পবিত্র, তিনি অমুখাপেক্ষী ও চিরঞ্জীব । তাই সন্তান বা জনক থাকা সৃষ্টিরই ধর্ম, স্রষ্টার নয়; এ আয়াত সেই সীমারেখা স্পষ্ট করে দেয় ।
গভীর সম্পর্ক। ‘সামাদ’ মানে সেই অমুখাপেক্ষী সত্তা, যাঁর প্রতি সবাই মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারও নন । সন্তান বা জনক থাকা মানেই কোনো না কোনো নির্ভরতা ও অভাব, যা সামাদিয়্যাতের বিপরীত; তাই ‘সামাদ’ বলার পরপরই ‘জন্ম দেননি, জন্ম নেননি’ এসে সেই অমুখাপেক্ষিতাকে নিশ্চিত করে । এরপর পরের আয়াত ‘সমকক্ষ কেউ নেই’ যোগ করে তাওহীদের ছবি পূর্ণ করে তোলে ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
সূরা ইখলাসের শেষ আয়াত ﴿وَلَمۡ يَكُنۡ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ﴾ ঘোষণা করে-তাঁর সমতুল্য, সমকক্ষ বা সদৃশ কেউ নেই। কুফু (كُفُو) শব্দের অর্থ নজির, সদৃশ, সমান ও সমমর্যাদাসম্পন্ন; তাই অর্থ দাঁড়ায়, সারা বিশ্বজাহানে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, কর্ম ও ক্ষমতার ব্যাপারে তাঁর সমান পর্যায়ে কেউ কোনোদিন ছিল না, নেই, হবেও না, এমনকি আকার-আকৃতিতেও কেউ তাঁর সাদৃশ্য রাখে না । মুখতাসারে সংক্ষেপে বলা হয়েছে-তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর কোনো সমতুল্য নেই । ইবনে কাসীর যুক্তি তুলে ধরেন-যে সৃষ্ট হয় সে একদিন মৃত্যুবরণ করে ও তার উত্তরাধিকারী হয়; কিন্তু আল্লাহ মৃত্যুবরণও করেন না, তাঁর উত্তরাধিকারীও কেউ নয়, তিনি কারো সন্তান নন এবং তাঁর সমতুল্যও কেউ নেই । জালালাইন ব্যাকরণগত সূক্ষ্মতা দেখান-কুফুয়ান (كُفُوًا) মানে সমকক্ষ ও সদৃশ; لَهُ শব্দটি কুফুয়ান-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত, আর একে আগে আনা হয়েছে কারণ অস্বীকারের মূল লক্ষ্যবিন্দু এটিই, এবং فاصلة তথা শেষাক্ষরের ছন্দ রক্ষার্থে أحَد পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে । যামাখশারী ও বিকাঈ একই কথা বলেন-এই বাক্যের মূল উদ্দেশ্যই আল্লাহর সত্তা থেকে সমকক্ষতা ও সমতা অস্বীকার করা, তাই সেই অর্থকেন্দ্রিক ظرف-কে সামনে আনা সর্বাধিক বলিষ্ঠ ফাসীহ রীতি । বিকাঈর মতে এই তিন আয়াত মিলে সামাদিয়্যাতেরই ব্যাখ্যা, যা সব রকম সাদৃশ্য নাকচ করে ।
শানে নুযূল হিসেবে সূত্রগুলোতে এসেছে, মুশরিক কুরাইশরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিল-"হে মুহাম্মদ! আমাদের কাছে তোমার প্রতিপালকের গুণ-পরিচয় বর্ণনা করো," তখন আল্লাহ পুরো সূরা ইখলাস নাজিল করেন । ইবনে কাসীর আরও উল্লেখ করেন, ইহুদিরা উযায়রকে ও খ্রিষ্টানরা ঈসাকে আল্লাহর পুত্র বলত, মাজুসীরা চন্দ্র-সূর্য এবং মুশরিকরা মূর্তিপূজা করত-এসবের জবাবেই এই সূরা ।
এ আয়াতের সবচেয়ে আলোচিত বালাগাত হলো শব্দবিন্যাস তথা তাকদীম-তাখীর: ظرف লَهُ কুফুয়ান-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েও তার আগে আনা হয়েছে, কারণ আয়াতের মূল লক্ষ্য আল্লাহর সত্তা থেকে সমকক্ষতা অস্বীকার-তাই সেই অর্থকেন্দ্রকেই সামনে আনা হয়েছে, আর أحَد (যা كان-এর ইসম) পিছিয়ে এসেছে فاصلة তথা আয়াত-শেষের ধ্বনিছন্দ রক্ষার্থে । যামাখশারী সিবাওয়াইহির আপত্তির জবাবে বলেন-যদিও সচরাচর লগব ظرف পিছিয়ে রাখা ফাসীহ, এখানে সামনে আনাই সর্বাধিক বলিষ্ঠ, কেননা এই ظرف-ই বাক্যের কেন্দ্রবিন্দু । বিকাঈ দেখান, এই তিন আয়াত যেন একক একটি বাক্যের মতো সামাদিয়্যাতের ব্যাখ্যা, এবং সূরার শেষ তার শুরুর সঙ্গে অভিন্নভাবে মিলে যায়-আখির তার আউয়ালের সঙ্গে সন্ধিস্থলে আঁটসাঁট জোড়ার মতো মিশে গেছে ।
এ আয়াতটি সরাসরি আগের আয়াত ﴿لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُوۡلَدۡ﴾-এর যৌক্তিক চূড়ান্ত পরিণতি। বিকাঈর ব্যাখ্যায় তৃতীয় ও চতুর্থ এ দুই আয়াত আগের সামাদ-বাক্যের উপর সংযুক্ত (معطوف), কারণ এ তিনটি মিলে সামাদিয়্যাতেরই বিশ্লেষণ, যা সব রকম সাদৃশ্যকে নাকচ করে-তাই তিনটি যেন একই বাক্য । জন্ম দেওয়া ও জন্ম নেওয়া অস্বীকার করার মানে তাঁর কোনো জাতি, প্রজাতি বা সঙ্গিনী নেই; আর জাতি-প্রজাতি না থাকলে সমতুল্যও থাকতে পারে না-তাই কুফু-র অস্বীকার আগের আয়াতের অনিবার্য ফল । ইবনে কাসীরও এ আয়াতকে আগেরগুলোর সঙ্গে এক সুতোয় গাঁথেন: যিনি জন্ম দেন না, কারো সন্তান নন, তাঁর সমতুল্যও কেউ নয় । যেহেতু এটিই সূরার শেষ আয়াত, পরের কোনো আয়াত নেই; বিকাঈ বলেন এখানে সূরার শেষ তার সূচনার (هُوَ اللَّهُ أحَدٌ) সঙ্গে পূর্ণ বৃত্ত রচনা করে মিলে যায় ।
পুরো সূরাটি এসেছিল একটি প্রশ্নের জবাবে-মুশরিকরা চেয়েছিল আল্লাহর একটা বংশ-পরিচয়, যেন তিনিও তাদের কল্পিত দেবতাদের মতো জাতিভুক্ত, সঙ্গীসাথিওয়ালা, সন্তানসন্ততিওয়ালা কেউ [৪][৬][৭]। সূরা শুরু হয়েছিল 'তিনি আল্লাহ, এক' দিয়ে, এরপর 'সামাদ'-যাঁর কাছে সবাই মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; তারপর বলা হলো তিনি জন্ম দেন না, জন্ম নেনও না। আর এই শেষ আয়াত সেই সবকিছুকে একটি অমোঘ সিলমোহরে আবদ্ধ করে দেয়: তাঁর সমতুল্য, সমকক্ষ, সদৃশ কেউ নেই-সত্তায় নয়, গুণে নয়, কর্মে নয়, এমনকি আকার-আকৃতিতেও নয় [১][২][৪]। যুক্তিটা সহজ ও অনিবার্য-যে জন্ম নেয় সে সৃষ্ট, আর যে সৃষ্ট সে একদিন মরবে ও তার উত্তরাধিকারী রেখে যাবে; কিন্তু আল্লাহ মরেন না, তাঁর উত্তরাধিকারীও নেই, তাই তাঁর সমকক্ষও থাকতে পারে না [৪]। আগের আয়াত থেকে এ আয়াতে আসাটা তাই একটানা একটা সুর-জন্ম-জন্মান্তরের অস্বীকার এসে মিলেছে সমতার সম্পূর্ণ অস্বীকারে [৭]। ভাষাও সেই কথাকেই জোর দেয়: 'তাঁর জন্য' কথাটিকে ইচ্ছে করে সামনে এনে দেওয়া হয়েছে, কারণ অস্বীকারের তীর ঠিক সেখানেই বিঁধছে-অন্য কারো সঙ্গে তাঁকে কোনো তুলনাই চলে না [৫][৬][৭]। আর এভাবেই সূরার শেষ তার শুরুর সঙ্গে বৃত্ত পূর্ণ করে: যিনি 'এক', তাঁর সত্যিকারের অর্থই হলো তাঁর কোনো দ্বিতীয় নেই [৭]।
কল্পনা করুন কেউ একজন শিল্পীর পরিচয় জানতে চাইল-তার বংশ, তার সমকক্ষ আর কারা। জবাবে বলা হলো, এই শিল্পীর মতো দ্বিতীয় কেউ নেই; কেউ তাঁর সমান নয়, কেউ তাঁর সদৃশও নয়। ঠিক এভাবেই মুশরিকরা যখন আল্লাহর বংশ-পরিচয় চাইল, জবাব এলো-তাঁর সমতুল্য, সমকক্ষ কেউই নেই । কুফু (كُفُو) মানে নজির, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদাসম্পন্ন; অর্থাৎ সত্তায়, গুণে, কর্মে কিংবা আকার-আকৃতিতে-কোনো দিক থেকেই কেউ তাঁর সমান পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না, পারবেও না ।
আবু বকর যাকারিয়া বিস্তারিত বলেন, মূলে শব্দটি 'কুফু' (كُفُو), যার মানে নজির, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সমতুল্য । জালালাইনে এর ব্যাখ্যা-মুকাফিআন (مُكافِئًا) তথা সমকক্ষ এবং মুমাসিলান (مُماثِلًا) তথা সদৃশ । তাই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়-না তাঁর সত্তায়, না গুণাবলিতে, না কর্মাবলিতে । আহসানুল বায়ান এর সমর্থনে কুরআনের আরেক আয়াত আনে-'তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই' (সূরা শুরা ৪২:১১) । সব মিলিয়ে শব্দটি সম্পূর্ণ, সর্বব্যাপী সাদৃশ্য-অস্বীকার বহন করে।
এ যেন একটি যুক্তির ধাপে ধাপে চূড়ান্ত পরিণতি। বিকাঈ দেখান, কুফু থাকার অর্থ হতো আল্লাহর কোনো জাতি ও শ্রেণি (جنس وفصل) আছে, আর তখন তাঁর অস্তিত্ব হতো জোড়া থেকে উৎপন্ন-যেখানে জাতি যেন মাতা, শ্রেণি যেন পিতা । কিন্তু আগেই প্রমাণিত হয়েছে তাঁর ক্ষেত্রে কোনো জন্মই চলে না, কারণ তাঁর অস্তিত্ব নিজ সত্তার দাবিতে অপরিহার্য (واجب الوجود) । তাই জন্ম অস্বীকারের পর সমতুল্য-অস্বীকার আসা নিছক পুনরাবৃত্তি নয়, বরং পূর্ববর্তী সত্যেরই অনিবার্য ও দৃঢ় নিশ্চিতকরণ ।
হ্যাঁ, এটিই এ আয়াতের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বালাগাত। জালালাইন বলেন, লাহু (لَهُ) সম্পৃক্ত কুফুয়ান-এর সঙ্গে, কিন্তু তাকে আগে আনা হয়েছে কারণ অস্বীকারের মূল লক্ষ্যবিন্দু এটিই, আর أحَد পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে আয়াত-শেষের ধ্বনিছন্দ (فاصلة) রক্ষার্থে । যামাখশারী এক চমৎকার প্রশ্ন তোলেন-সিবাওয়াইহির মতে তো লগব ظرف পিছিয়ে রাখাই ফাসীহ, তবে এখানে সামনে কেন? উত্তরে বলেন, এ বাক্যের সমগ্র উদ্দেশ্যই আল্লাহর সত্তা থেকে সমতা অস্বীকার, আর সেই অর্থের কেন্দ্রই এই ظرف-তাই সামনে আসার সর্বাধিক যোগ্য সে ।
আছে, এবং তাফসিরকাররা সেগুলো টেনে এনে আয়াতটিকে আলোকিত করেন। আহসানুল বায়ান উদ্ধৃত করে সূরা শুরার আয়াত-'তাঁর মতো কোনো কিছুই নেই' (৪২:১১) । আবু বকর যাকারিয়া সন্তান-অস্বীকার প্রসঙ্গে আনেন সূরা নিসা ১৭১, সাফফাত ১৫১-১৫২, যুখরুফ ১৫, আনআম ১০০-১০১, আম্বিয়া ২৬ ও ইসরা ১১১-সবগুলো মিলে যেন সূরা ইখলাসের বিস্তৃত ব্যাখ্যা । ইবনে কাসীরও আনেন আনআম ১০১, মারইয়াম ৮৮-৯৫ ও আম্বিয়া ২৬-২৭-দেখাতে যে সব কিছুর স্রষ্টা ও মালিকের সমকক্ষতার দাবি করার মতো কেউই থাকতে পারে না ।
ইবনে কাসীর বহু হাদিস উদ্ধৃত করেন যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সূরা ইখলাস কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য । কারণ হিসেবে যামাখশারী ও বিকাঈ ব্যাখ্যা দেন-সংক্ষিপ্ত হলেও এ সূরা আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, তাওহিদ ও ন্যায়বিচার ধারণ করে, তাই একে 'সূরাতুল আসাস' তথা মূলনীতির সূরা বলা হয় । বিকাঈ যোগ করেন, দ্বীন তিন স্তম্ভে দাঁড়িয়ে-বিশ্বাস, বিশ্বাসের অনুবাদক ভাষাকর্ম, ও তা যাচাইকারী কর্ম; এ সূরা বিশ্বাসের শিরোভাগ তাওহিদকে পূর্ণরূপে ধারণ করায় এক-তৃতীয়াংশের সমান ।
সরাসরি মূল ক্লাসিক তাফসীর - হুবহু, সম্পাদনা ছাড়া।
একটি তাফসীর বেছে নিন।
আরও পড়ুন: Bangla Tafheem · Quran.com
অডিও: EveryAyah.com - মিশারি রাশিদ আল-আফাসী (সুন্দর তিলাওয়াত), মাহমুদ খলিল আল-হুসারী মুআল্লিম (তাজবীদ শিক্ষা)